ডায়াবেটিস (Diabetes) শুধু রক্তে শর্করা বৃদ্ধির সমস্যা নয়, দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে এটি শরীরে আরও গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টাইপ-২ ডায়াবেটিস (Type 2 Diabetes)-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। তবে এই তথ্য আতঙ্কের নয়, বরং সময়মতো চিকিৎসা ও সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরছে।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডায়াবেটিস ও ক্যানসারের মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্রের অন্যতম কারণ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স (Insulin Resistance)। যখন শরীর ইনসুলিনের প্রতি স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিতে পারে না, তখন রক্তে দীর্ঘ সময় ধরে ইনসুলিনের মাত্রা বেশি থাকে। এই অতিরিক্ত ইনসুলিন কোষের বৃদ্ধি ও বিভাজনে প্রভাব ফেলতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
শুধু ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সই নয়, দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং শরীরে চলতে থাকা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহও এই ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করায় কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পায়।
বিভিন্ন গবেষণাতেও এই সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একটি বৃহৎ জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় দেখা যায়, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে সামগ্রিকভাবে ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে লিভার, অগ্ন্যাশয় এবং জরায়ুর ক্যানসারের সঙ্গে এই রোগের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
অন্যদিকে, একাধিক ক্যানসার রোগীকে নিয়ে করা একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গিয়েছে, আগে থেকেই ডায়াবেটিস থাকলে দীর্ঘমেয়াদে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৪১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। যদিও গবেষকরা জানিয়েছেন, এর পিছনে একাধিক শারীরবৃত্তীয় কারণ কাজ করতে পারে এবং প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে ঝুঁকি একই রকম হয় না।
যাঁদের ইতিমধ্যেই ক্যানসার ধরা পড়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস চিকিৎসা আরও কঠিন করে তুলতে পারে। সংক্রমণের আশঙ্কা বৃদ্ধি, অস্ত্রোপচারের পর ক্ষত শুকোতে দেরি হওয়া এবং কেমোথেরাপির (Chemotherapy) কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিশেষ করে পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি (Peripheral Neuropathy), আরও তীব্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে।
ডায়াবেটিসের বহুল ব্যবহৃত ওষুধ মেটফরমিন (Metformin)-কেও ঘিরে গবেষণা চলছে। কিছু গবেষণায় এই ওষুধের সম্ভাব্য ক্যানসার-প্রতিরোধী ভূমিকার ইঙ্গিত মিললেও, এখনও পর্যন্ত তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। তাই শুধুমাত্র ক্যানসার প্রতিরোধের আশায় এই ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্যই মেটফরমিন ব্যবহার করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্যের উদ্দেশ্য ভয় তৈরি করা নয়, বরং সচেতনতা বৃদ্ধি করা। নিয়মিত ফাস্টিং ও পোস্ট-প্র্যান্ডিয়াল ব্লাড সুগার পরীক্ষা, HbA1c পর্যবেক্ষণ, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, প্রতিদিন শরীরচর্চা করা এবং বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ক্যানসার স্ক্রিনিং করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে কোনও অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা মানে শুধু রক্তে শর্করা স্বাভাবিক রাখা নয়, দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনযাপন ও ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানোর দিকেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।



