রাজনীতিকে বিদায় জানাচ্ছেন বঙ্গ বিজেপির অন্যতম স্তম্ভ দিলীপ ঘোষ? প্রথম সারির একটি সংবাদমাধ্যমে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে জল্পনা। আর এবার শুধু জল্পনাই নয়, কিছুটা মনস্থিরও যেন করে ফেলেছেন ‘নিঃসঙ্গ সম্রাট’! লোকসভা নির্বাচনে তাঁর তুলনায় রাজনীতিতে আনকোরা তৃণমূলের ক্রিকেটার প্রার্থী কীর্তি আজাদের কাছে হার কি মনোবল একেবারে ভেঙে দিয়েছে? দল কি দিলীপের পাশে নেই? আর কি ঘুরে দাঁড়াবার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না? গুচ্ছের প্রশ্নের মধ্যেও দিলীপের অবসরের সিদ্ধান্ত সত্যি হলে রাজনৈতিক মহল যে কিছুটা বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়বে তা বলাই বাহুল্য। কারণ, আর যাই হোক, দিলীপ বঙ্গ রাজনীতির এক ব্যতিক্রমী চরিত্র সে বিষয়ে হয়তো কোনও সন্দেহ নেই।
২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ছিলেন দিলীপ ঘোষ। ২০১৬ সালে নিজে ভোটে জিতে বিধায়ক হন খড়্গপুর সদর কেন্দ্র থেকে। হারিয়ে দেন কংগ্রেসের ‘চাচা’ জ্ঞান সিংহ সোহনপালকে! এখনও পর্যন্ত এ রাজ্যে বিজেপির সবচেয়ে সফল সভাপতি তিনিই। তাঁর নেতৃত্বেই ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে বাংলায় ১৮টি আসনে জয় পায় বিজেপি। তার আগের ২০১৪ লোকসভায় বিজেপি জিতেছিল মাত্র ২টি আসন। অর্থাৎ, এক ধাক্কায় ১৬টি আসন বেড়েছিল পদ্মের। দিলীপ নিজে জেতার পাশাপাশি আরও ১৭ জনকে জেতাতে সমর্থ হন ‘আনলাকি’ উনিশ সালেও।

একই রকমভাবে, ২০২১ সালের বিধানসভায় ৭৭টি আসন জেতে। বিগত নির্বাচনের তুলনায় আসন বাড়ে ৭৪টি! কিন্ত এত কিছু হলেও তিনি যে কোনও কারণেই হয়তো সন্তুষ্ট করতে পারেননি শীর্ষ মহলকে। একুশেই একেবারে বাংলায় পালাবদল চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা। তা না হওয়ায় দিলীপকে বঙ্গ বিজেপির সভাপতি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পান বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি পদ। কিছুদিনের মধ্যেই সেখান থেকে অপসারণ!
এতদূর পর্যন্ত কাহিনী কমবেশি সকলেরই জানা। লোকসভা নির্বাচনে হারের পর নিজের কেন্দ্র বদলের জন্য বেশ কয়েকবার ক্ষোভ উগড়ে দেন দলের নেতৃত্বের প্রতি। কিন্তু, হয়তো বুঝেছিলেন তাঁর ‘যুগ’ শেষ। নবীন প্রজন্ম বুঝবে না সব কথা। তাঁর মেদিনীপুরেরই আর এক বিধায়ক অশোক দিন্দা সাফ বলেন, হেরে-ফেরে গিয়ে এরকম অজুহাত দিয়ে লাভ নেই! সময়টা বদলেছে বঙ্গ রাজনীতির। এখন হাল সুকন্ত মজুমদার, শুভেন্দু অধিকারীর হাতে।

হারের কারণ বিশ্লেষণের জন্য সল্টলেকে যে বৈঠক ডাকে বিজেপি, সেখানে উপস্থিত ছিলেন দিলীপ ঘোষ। ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে সেখানে প্ল্যান করে বঙ্গ পদ্ম-শিবির। সব নেতাকে ‘কাজ’ বুঝিয়ে দিলেও সূত্রের খবর, দিলীপকে নির্দিষ্ট করে কোনও ‘দায়িত্ব’ দেওয়া হয়নি। কিন্তু ‘চুপ’ করে থাকার পাত্র তিনি নন। দল নির্দেশ না দিলেও তিনি বেরিয়ে পড়েন। স্বাধীনভাবে জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়ান, কর্মীদের মনোবল বাড়ান। আদি বিজেপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখান থেকেই এই অবসরের সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চলেছেন দিলীপ।
তিনি কাজ পাগল মানুষ। তাই তাঁর বক্তব্য, এভাবে কাজ না দিলে তাঁর পক্ষে শুধুমাত্র ‘থেকে যাওয়ার জন্য থেকে যাওয়া’ অর্থহীন। তিনি চান দায়িত্ব। শুধু দায়িত্ব নয়, গুরুতর দায়িত্ব। দলের কর্মীদের অনেকাংশই তাঁর পক্ষে রয়েছে এখনও। এ রাজ্যে বিজেপির সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা দিলীপ ঘোষ, এ কথাটাও বোধহয় খুব অসত্য নয়। তবে, তিনি বলেছেন, এরকম প্রাক্তন হয়ে তিনি থেকে যেতে পারবেন না। তবে, দিলীপের সব সিদ্ধান্তই যে কেন্দ্রীয় বিজেপির ওপর নির্ভরশীল তা স্পষ্ট।
বাজল ছুটির ঘন্টা, রাজনৈতিক অবসরের পথে দিলীপ ঘোষ!

কারণ, বর্তমান রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন। তাঁকে শিক্ষা ও উত্তর-পূর্ব উন্নয়ন মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী করেছেন নরেন্দ্র মোদি। ফলে, বিজেপির ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি অনুযায়ী রাজ্য সভাপতি বদল কাম্য। সেখানেই কি আবার ফিরবেন দিলীপ? দলের কর্মীরা তেমনটা চাইলেন, অনেক নেতা আবার চাইছেন না! বিজেপি সূত্রে খবর, রাজ্য কমিটিতে বদল আসতে আসতে সেপ্টেম্বর মাস। সেখানেও দিলীপের ফের রাজ্য সভাপতি হওয়াটাও নিশ্চিত নয়। পদ না পেলে দিলীপ কী করবেন?
দিলীপ সেটাই ভেবে রাখলেন। যদি দল তাঁকে আবার দায়িত্ব না দেয় তাহলে তিনি রাজনীতি থেকে সরে আসবেন। বিগত পাঁচ বছর সাংসদ ছিলেন। ফলে, সংগঠনে কাজ না থাকলেও দিল্লিতে কাজ ছিল। এবার তা নেই। সকালে ব্যায়াম করছেন, দুপুরে মজা করে মাছ ধরছেন! কিন্তু এভাবে কত দিন? তিনি দীর্ঘদিন সঙ্ঘের প্রচারক হিসাবে কাজ করেছেন। আন্দামনে গিয়েছেন। তাহলে আবার সঙ্ঘের জীবনেই ফিরে যাবেন দিলীপ? জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকেও নির্বাসন দেবেন নিজেকে? দিলীপ জানেন তাঁর সিদ্ধান্ত, অপেক্ষা আর মাত্র মাস দুয়েকের!



