প্রায় ন’মাস পর বিধাননগরের বিজেপি দফতরে পা রেখেই পুরনো ছন্দে ফিরলেন দিলীপ ঘোষ। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ডাকে সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরার পর প্রথম দিনই সাংবাদিক বৈঠক, রাজ্য সভাপতি-সংগঠন সম্পাদকের সঙ্গে বৈঠক—সব মিলিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, তিনি ফিরেছেন ‘স্বমহিমায়’। আর সেই প্রত্যাবর্তনের প্রথম দিনেই তৃণমূল থেকে বিজেপিতে আসা নেতাদের আচরণ নিয়ে প্রকাশ্যে কটাক্ষ করে দলের অন্দরে নতুন করে জল্পনা উসকে দিলেন প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি।
বৃহস্পতিবার রাজ্য বিজেপি দফতরে গিয়ে বর্তমান রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ও সংগঠন সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তীর সঙ্গে বৈঠক করেন দিলীপ। পরে সাংবাদিক বৈঠকে মে মাসে তাঁকে ঘিরে দলের অন্দরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই চেনা মেজাজে ব্যাট চালান তিনি। দিলীপের মন্তব্য, “কিছু লোক বাইরে থেকে ঢুকে পড়েছে। কখন কাকে কালো পতাকা দেখাতে হয়, সেটাই ভুলে যায়!” তাঁর ব্যাখ্যায় স্পষ্ট ইঙ্গিত—তৃণমূলের ‘কালো পতাকা’ সংস্কৃতি বিজেপির অন্দরে ঢুকে পড়েছে, যা তিনি কোনও ভাবেই মানতে রাজি নন।

দিলীপের এই বক্তব্যে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, তৃণমূল থেকে বিজেপিতে আসা নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম শুভেন্দু অধিকারী। দিলীপ ও শুভেন্দুর সম্পর্ক যে বরাবরই তিক্ত, তা অজানা নয়। গত লোকসভা ভোটে মেদিনীপুর থেকে দিলীপকে সরিয়ে অন্য আসনে প্রার্থী করার নেপথ্যে শুভেন্দুর ভূমিকা ছিল—এমন জল্পনা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে, যদিও তার কোনও আনুষ্ঠানিক প্রমাণ নেই। তবে দিলীপ ফের সক্রিয় হয়ে প্রথম দিনেই ‘তৃণমূল থেকে আসা’ নেতাদের প্রসঙ্গ তোলায়, সেই পুরনো সমীকরণ আবার আলোচনায়।

লোকসভা ভোটের প্রসঙ্গ টেনে দিলীপ বলেন, ২০২৪ সালে তাঁর আসন বদলের ফল কী হয়েছিল, তা সকলেই দেখেছেন। সে সময় দলকে নিজের প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। বিধানসভা ভোটে লড়াইয়ের প্রশ্নে দিলীপ স্পষ্ট—দল চাইলে তিনি লড়বেন। পছন্দের আসন জানতে চাওয়া হলে আগের মতোই খড়্গপুর সদরের কথাই বলবেন, সে কথাও রাখঢাক না করেই জানিয়েছেন।
রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য দিলীপের প্রত্যাবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবেই তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, এত দিন দিলীপ ‘ঘরে বসে রণকৌশল’ তৈরি করছিলেন, এখন সেই কাজ শেষ হওয়ায় আবার মাঠে নামছেন। দিলীপও বৈঠক শেষে বলেন, রাজ্য সভাপতি যে দায়িত্ব দেবেন, তা পালন করতেই তিনি প্রস্তুত। নতুন কমিটি, নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তদের সম্পর্কেও খোঁজখবর নিয়েছেন বলে জানান তিনি।


দীর্ঘদিন দলীয় দফতরে না আসা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে দিলীপের খোঁচা, “পার্টি অফিসে এলেই সবাই রণকৌশল ঠিক করেন না। কেউ কেউ চা-ও খান।” একই সঙ্গে দিঘায় জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনে গিয়ে বিজেপি কর্মীদের বিক্ষোভের প্রসঙ্গেও তিনি বলেন, যারা গো ব্যাক বা কালো পতাকা দেখিয়েছিল, তারা বিজেপির কর্মীই নয়—বিশেষ পরিস্থিতিতে বাইরে থেকে আসা লোক।
আগামী দিনে দিলীপকে আরও সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যাবে, তার ইঙ্গিত মিলেছে। ১৩ জানুয়ারি দুর্গাপুরে শমীকের জনসভায় তাঁর সঙ্গে থাকছেন দিলীপও। শুভেন্দু ডাকলে যাবেন কি না—সে প্রশ্নে দিলীপের উত্তর কৌশলী। তিনি বলেন, দল চাইলে রাজ্যজুড়ে আলাদা আলাদা জায়গায় সভা করাই বেশি কার্যকর হবে।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘ বিরতির পর দিলীপ ঘোষের প্রত্যাবর্তন শুধু সাংগঠনিক নয়, বিজেপির অন্দরের সমীকরণেও নতুন করে ঢেউ তুলতে শুরু করেছে।








