কিছুদিন আগে ব্রিটেনে ক্ষমতায় এসেছে লেবার পার্টি। যা নিয়ে এ দেশে কম্যুনিস্ট সমর্থকদের উত্তেজনা ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। যদিও এই লেবার পার্টির বর্তমান ম্যানিফেস্টোর সঙ্গে বামপন্থার মিল-অমিল নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। তবুও, উচ্ছ্বাসকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু, নিজেদের দেশে একের পর এক নির্বাচনে বামেদের যে হতশ্রী ফলাফল তা নিয়ে গঠনমূলক কোনও আলোচনা কেন দেখা যায় না? সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র, ‘আমরা সকলের চেয়ে আলাদা’ আর ‘বামপন্থা নির্বাচনী রাজনীতির জন্য উপযুক্ত নয়’ বলেই দায় ঝেড়ে ফেলেন অর্ধেকের বেশি ভারতীয় কম্যুনিস্ট।
কিন্তু, প্রত্যাশা তো এ দেশেও রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের কথাই যদি বলা যায়, সেখানে বাংলায় মোট ২৩ আসনে প্রার্থী দেয় সিপিআইএম। জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে ২১ জনেরই। লোকসভার আগে বাম নেতানেত্রীরা একবারও নিজেদের এই অবস্থা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন কি? বরং, কনফিডেন্সের শিখরে দাঁড়িয়েই বলতেন আমরাই জিতব। প্রচারে এ কথা মানা যায়, দলের অন্দরেও যে ঔদ্ধত্য একই রকমভাবে আজও বজায় রয়েছে, সেটাই ভাবায়।

লোকসভার আগে বাম নেতারা কেউ বলতে পারবেন না, তাঁরা মিডিয়া হাইপ পাননি। বরং তাঁদের দলের নতুন মুখদের নিয়েই যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে, প্রচার হয়েছে। তা সত্ত্বেও ফল আশানুরূপ হয়নি। বিশেষ করে বাংলার সিপিআইএম। বিহারে সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন তবুও সাফল্যের মুখ দেখেছে। তাঁদের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভটাচার্য বঙ্গ বাম নেতৃত্বের বিভিন্ন প্রচারের সমালোচনাও করেন। ‘বিজেমূল’ তত্ত্ব যেটা একুশের বিধানসভা থেকে ‘আমদানি’ করেছে বামেরা, তার সমালোচনা করেন।
সম্প্রতি রাজ্যে আসেন সিপিআইএম-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। তাঁর মুখেও সেই একই কথা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল সরকারের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ইত্যাদি জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের বিরোধিতা করে কালিদাসের মতো নিজের ডালে কুড়োল চালিয়েছে সিপিআইএম, এরকম বলেন। অন্যদিকে, আবার বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য যুবনেত্রী মীনাক্ষি মুখ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করে দলেরই রোষের মুখে পড়েন। কী ভুল বলেছিলেন বিকাশ? মীনাক্ষির নিজের বুথে মাত্র ৪৬ ভোট পেয়েছে লোকসভায় বামেরা। সমাজমাধ্যমে অতিপ্রচারের বিরোধিতা করেন বিকাশ, ব্যক্তিপ্রচারের বিরুদ্ধে দলগত প্রচারকে গুরুত্ব দিতে বলেন, যেটা কম্যুনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রধান আদর্শ হিসাবেই পরিচিত। অথচ তাঁকে নিয়েই সমালোচনা হয় যুবদের মধ্যে।
নির্বাচন আসে, নির্বাচন যায়, বামেদের ‘সুদিন’ তবুও কেন আসে না, হায়!

অর্থাৎ, আত্মসমালোচনা। যেটা ইদানিং সময়ে একেবারেই ভুলতে বসেছে বামেরা। সমাজমাধ্যমে বামেদের একাধিক পেজ খুললেই দেখা যায় শুধুমাত্র কুৎসা আর অন্য দলগুলির প্রতি একটা ‘দলিত’ মনোভাব। এবার বাংলার চার কেন্দ্রের বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলাফলও প্রকাশ হল। সব ক’টিই তৃণমূলের ঝুলিতে। সেখানে বামেরা ভোট পেয়েছে চার কেন্দ্র মিলিয়ে ১৭ হাজারের কিছু বেশি, তাও কংগ্রেসের হাত ধরে। আর বছর দুয়েক পর আবার বিধানসভা নির্বাচন। বামপন্থার ওপর মানুষের বিশ্বাস নেই, এটা কি ঠিক কথা? নাকি মানুষের ওপর নিজেদের বিশ্বাস হারিয়েছেন বামে নেতারা? জবাব চান সমর্থকেরা।



