ভেজাল কাশির ওষুধে ২০ শিশুর মৃত্যু, শ্রীসান ফার্মার মালিক গ্রেফতার

মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানে কোল্ডরিফ সিরাপ খাওয়ার পর একাধিক শিশুর মৃত্যু। ডাইথিলিন গ্লাইকোলযুক্ত সিরাপ তৈরির অভিযোগে কোম্পানির মালিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভেজাল কাশির ওষুধ (Cough Syrup) সংক্রান্ত ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা দেশে। মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানে কোল্ডরিফ সিরাপ (Coldrif Syrup) খাওয়ার পর অন্তত ২০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। এই ঘটনার জেরে সিরাপ প্রস্তুতকারক সংস্থা শ্রীসান ফার্মার (Srisan Pharma) মালিক রঙ্গনাথনকে গ্রেফতার করা হয়েছে চেন্নাই থেকে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তাঁকে গতকাল রাতে গ্রেফতার করে ট্রানজিট রিমান্ডে মধ্যপ্রদেশের ছিন্দওয়ারা জেলায় নিয়ে যাওয়া হবে। গ্রেফতারের আগে তাঁকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে সংস্থার বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা দায়ের করেছে মধ্যপ্রদেশ পুলিশ।

এই বিষাক্ত সিরাপ খাওয়ার পর মৃত শিশুদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের নিচে। মৃত্যু হয়েছে মূলত ছিন্দওয়াড়া, পান্ধুরনা ও বেতুল জেলার শিশুদের। চিকিৎসকরা জানান, কোল্ডরিফ সিরাপ পান করার পর শিশুদের কিডনি বিকল (Kidney Failure) হয়ে যায়।

ভেজাল কাশির ওষুধে ২০ শিশুর মৃত্যু, শ্রীসান ফার্মার মালিক গ্রেফতার

ভেজাল কাশির ওষুধে ২০ শিশুর মৃত্যু, শ্রীসান ফার্মার মালিক গ্রেফতার
ভেজাল কাশির ওষুধে ২০ শিশুর মৃত্যু, শ্রীসান ফার্মার মালিক গ্রেফতার

তামিলনাড়ুর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ মাসের শুরুতে কোল্ডরিফ সিরাপের নমুনায় ডাইথিলিন গ্লাইকোল (Diethylene Glycol) নামের এক বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি পায়। এই রাসায়নিক ৪৮.৬ শতাংশ পরিমাণে পাওয়া গিয়েছিল—যা অনুমোদিত সীমার চেয়ে প্রায় ৫০০ গুণ বেশি

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রাসায়নিকটি শিল্প গ্রেডের এবং অল্প পরিমাণেও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে।

রাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ দফতরের রিপোর্টে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেখা গেছে, শ্রীসান ফার্মা বিনা বিলেই নন-ফার্মাসিউটিক্যাল গ্রেড প্রোপিলিন গ্লাইকোল কিনেছিল। কাঁচামালের কোনও ল্যাব টেস্ট হয়নি। ব্যাচ রিলিজ প্রক্রিয়াতেও চরম অবহেলা করেছে সংস্থা।

তামিলনাড়ুর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, কোম্পানির সুঙ্গুভারচত্রম ইউনিটে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অনুপযুক্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে সেটি সিল করে দেওয়া হয়েছে। এই ইউনিটটি ১৪ বছর ধরে চেন্নাই-বেঙ্গালুরু মহাসড়কে চালাচ্ছিল সংস্থা।

শ্রীসান ফার্মা শুধু মধ্যপ্রদেশ নয়, রাজস্থান, পুদুচেরি ও ওড়িশাতেও এই বিষাক্ত সিরাপ সরবরাহ করত। তামিলনাড়ু সরকার ইতিমধ্যে অন্যান্য রাজ্যগুলিকে কোল্ডরিফ সিরাপ বিক্রি বন্ধের জন্য সতর্কতা জারি করেছে

এদিকে, কেন্দ্রীয় সরকার আরও দুটি ব্র্যান্ড—রিলিফ (Shape Pharma)রেসপিফ্রেশ (Rednex Pharmaceuticals)—বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এই ব্র্যান্ডগুলিতেও অনুরূপ সমস্যা ধরা পড়েছে বলে জানা গিয়েছে।

এই ভয়াবহ মৃত্যুর ঘটনায় মধ্যপ্রদেশ সরকার সাত সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করেছে। দলের নেতৃত্বে রয়েছেন সিনিয়র পুলিশ আধিকারিকরা। তারা ইতিমধ্যে চেন্নাইয়ে শ্রীসান ফার্মার অফিস ও ইউনিট তল্লাশি করেছে।

এই ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে প্রবীণ সোনি নামে এক চিকিৎসককেও গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযোগ, তিনি শিশুদের জন্য এই ভেজাল সিরাপ প্রেসক্রাইব করেছিলেন। তদন্তে উঠে এসেছে, সিরাপের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে না জেনেই তিনি একাধিক প্রেসক্রিপশন দিয়েছিলেন।

এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কেলেঙ্কারি নয়, এটি একটি ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাইথিলিন গ্লাইকোল-এর উপস্থিতি ১৯৩৭ সাল থেকেই বিভিন্ন দেশে ওষুধের বিপর্যয়ের কারণ হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় শুধু সংস্থা নয়, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবেও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের ওষুধ প্রস্তুত ও সরবরাহ ব্যবস্থায় মান নিয়ন্ত্রণে ফাঁকফোকর থেকেই এই ধরনের বিপর্যয় ঘটে। নিম্নমানের রাসায়নিক ব্যবহার, কাঁচামালের পরীক্ষা না করা ও অনুমোদন ছাড়া উৎপাদন—সব মিলিয়ে একটি বিপজ্জনক চেইন তৈরি হয়, যার শিকার সবচেয়ে অসহায় শিশুরাই।

এই মর্মান্তিক ঘটনাটি দেশের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন জরুরি ভিত্তিতে সমস্ত কাশির সিরাপ ও শিশুদের ওষুধের গুণমান পরীক্ষা করার দাবি উঠছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত