বিরল খনিজ (Rare Earth Minerals) নিয়ে শুরু হওয়া চিন-আমেরিকা সংঘাত এবার বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে। চিনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগেই তৎপর হয়েছে আমেরিকা (USA)। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) প্রশাসন জানিয়ে দিয়েছে, এই লড়াইয়ে একা নয়, পাশে চাই ভারত ও ইউরোপকে।
মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট (Scott Bessent) সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “চিনের তরফে বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলের (Global Supply Chain) উপর বিরাট ধাক্কা। এটি কেবল চিন ও আমেরিকার লড়াই নয়—এটি চিন বনাম গোটা বিশ্বের সংঘাত।”
চিন ৯ অক্টোবর যে নির্দেশিকা জারি করেছে, তার অনুযায়ী, ০.১ শতাংশের বেশি বিরল খনিজযুক্ত পণ্য রপ্তানির আগে সরকারি অনুমতি নিতে হবে। বিশেষত বিদেশি সামরিক ব্যবহারের জন্য খনিজ রপ্তানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়াও নতুন কয়েকটি খনিজকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করেছে বেজিং।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এই সিদ্ধান্তকে “আক্রমণাত্মক ও উদ্বেগজনক” বলছে আমেরিকা। কারণ আধুনিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরিতে বিরল খনিজ অপরিহার্য। স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সেমিকন্ডাক্টর, ক্ষেপণাস্ত্র—সব ক্ষেত্রেই এই খনিজই মূল চালিকাশক্তি।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সর্বাধিক বিরল খনিজের মজুত রয়েছে চিনে—৪৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন। দ্বিতীয় স্থানে ব্রাজিল (২১ মিলিয়ন) এবং তৃতীয় স্থানে ভারত (৬.৯ মিলিয়ন)। কিন্তু শুধু মজুত নয়, বিশ্বের ৭০% খনিজ খনন ও ৯০% এর বেশি প্রক্রিয়াকরণে চিন একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করছে। এই অবস্থাতেই নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে চলেছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ১ নভেম্বর থেকে চিনা পণ্যের উপর অতিরিক্ত ১০০% শুল্ক আরোপ করা হবে। সবমিলিয়ে মোট শুল্ক দাঁড়াবে ১৩০%। ট্রাম্প বলেছেন, “চিনের মনোভাব অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। আমেরিকা তার শিল্প রক্ষা করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য।”
তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাম্পের স্বর কিছুটা নরম হয়। তিনি লেখেন, “আশা করি সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। প্রেসিডেন্ট শি’র দিনটা খারাপ গেছে। আমরা চিনকে আঘাত করতে চাই না, সাহায্য করতে চাই।” এই বার্তায় কূটনৈতিক ইঙ্গিত স্পষ্ট—লড়াই যেমন কড়া হবে, তেমনই দরজা খোলা থাকবে আলোচনার জন্যও।
স্কট বেসেন্ট আরও বলেন, “চিনের এই সিদ্ধান্ত শক্তি প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং দুর্বলতার লক্ষণ। আমেরিকা এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিশ্বকে একত্রিত করতে চাইছে।” তিনি জানান, ভারত, ইউরোপ এবং এশিয়ার একাধিক দেশের সঙ্গে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু করেছে আমেরিকা, যাতে একত্রে চিনের এই ‘অস্ত্রনীতি’র মোকাবিলা করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিরল খনিজের ভূ-রাজনীতি (Geopolitics of Rare Earth)। চিন গত কয়েক দশকে কৌশলগতভাবে বিরল খনিজে আধিপত্য গড়ে তুলেছে। এখন তারা এই সম্পদকে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
ভারতও এই খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও, এখনও পর্যন্ত পর্যাপ্ত খনন ও প্রক্রিয়াকরণ পরিকাঠামো গড়ে উঠেনি। কিন্তু এই সংকটে ভারতের সামনে সুযোগ এসেছে নিজেকে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরার। ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে খনিজ সহযোগিতা ও প্রযুক্তি স্থানান্তর নিয়ে আলোচনা চলছে বলে সূত্রের খবর।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নও (EU) চিনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে বিকল্প খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরিতে উদ্যোগী হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের ধারণা, ভারত-ইউরোপ-আমেরিকা যৌথ উদ্যোগেই চিনের ‘খনিজ অস্ত্রনীতি’ ব্যর্থ করা সম্ভব।
বিশ্ব বাজারে বিরল খনিজের দাম ইতিমধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীদের মতে, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হলে এর প্রভাব পড়বে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে অটোমোবাইল পর্যন্ত প্রায় সব খাতে। ফলে এই সংঘাত শুধুমাত্র দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করবে।



