উত্তরবঙ্গের ত্রাণে ‘বাম পদ্ধতি’ অবলম্বন রামের, ‘বিজেপি আগে ক্ষমা চেয়ে নিক’ বলল সিপিআইএম

উত্তরের দুর্যোগে ত্রাণ সংগ্রহে বামদের ঐতিহ্যবাহী ‘কৌটো নাড়ানো’ পথে নামল বিজেপি। কটাক্ষ সিপিএমের—“যা নিয়ে ব্যঙ্গ করেছিল, আজ সেই পথেই ফিরছে তারা”।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

উত্তরবঙ্গের ভয়াবহ দুর্যোগ ও বন্যা পরিস্থিতি ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। ত্রাণ সংগ্রহে এবার ‘বামপন্থী পদ্ধতি’ বেছে নিয়েছে বিজেপি। বাক্স, বালতি বা চাদর হাতে নিয়ে পথে নেমে অর্থসংগ্রহ—যে চিত্র এত দিন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে দেখা যেত, সেটাই এখন দেখা যাচ্ছে গেরুয়া শিবিরে। আর এই পরিবর্তনেই রাজনৈতিক তীর ছুঁড়ছে সিপিএম (CPIM)।

সিপিএমের বক্তব্য, বিজেপি এতদিন ‘কৌটো নাড়ানো রাজনীতি’ বলে যেটিকে ব্যঙ্গ করেছে, আজ সেই পথই তাদের বেছে নিতে হয়েছে। পাল্টা বিজেপির দাবি, এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে সামাজিক সংহতির বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে দল।

গত শুক্রবার দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়াহাট মোড়ে প্রথম অর্থসংগ্রহের কর্মসূচিতে অংশ নেন বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি ও কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। বাজার, সব্জিপট্টি, মাছ-মাংসের দোকান—সব জায়গায় ঘুরে ঘুরে ত্রাণের জন্য চাঁদা তোলেন তিনি। সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পেয়ে সুকান্ত পরবর্তী দু’দিন বারাসত ও নিজের কেন্দ্র বালুরঘাটেও একই কর্মসূচিতে অংশ নেন।

শুধু দক্ষিণবঙ্গ নয়, উত্তরবঙ্গেও দৃশ্যপট একই। গাজোলের বিধায়ক চিন্ময় দেববর্মণ, শিলিগুড়ির শঙ্কর ঘোষ, কালচিনির বিশাল লামা—সবাইকে দেখা গেছে ত্রাণের বাক্স হাতে নিয়ে রাস্তায়। উত্তর কলকাতায় কাউন্সিলর সজল ঘোষের নেতৃত্বে সকাল থেকেই শুরু হয় ত্রাণসংগ্রহ অভিযান। দক্ষিণ কলকাতার কসবা এলাকায় বিজেপি নেত্রী কেয়া ঘোষের নেতৃত্বেও চলে একই কর্মসূচি।

এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ বিজেপি কর্মীরাও স্থানীয়ভাবে চাঁদা তুলছেন। কারও হাতে কৌটো, কারও হাতে বালতি, কাঁধে দলীয় পতাকা—চেনা ‘বামপন্থী’ ছবিতে এখন রঙ গেরুয়া।

উপমন্যু ভট্টাচার্য, দক্ষিণ কলকাতা জেলা বিজেপির কার্যনির্বাহী সদস্য ও গড়িয়াহাট কর্মসূচির অন্যতম আয়োজক বলেন, “রাস্তায় অর্থসংগ্রহ করতে নেমে এমন সাড়া পাব, ভাবিনি। বিক্রেতারা কাজ ফেলে এগিয়ে এসেছেন।” কেয়া ঘোষের কথায়, “অনেকে সামর্থ্য অনুযায়ী ১০ টাকাও দিতে এগিয়ে আসছেন। আমরা আপ্লুত।”

এই অভিজ্ঞতা বিজেপির কাছে নতুন। কিন্তু বামেদের কাছে নয়। সিপিএমের আমলে দুর্যোগের সময় এইভাবেই রাজ্যজুড়ে ত্রাণ সংগ্রহ করতেন নেতাকর্মীরা। বিমান বসু থেকে শুরু করে স্থানীয় শাখা—‘বাম পদ্ধতি’ বলতে বাংলার মানুষ যা বোঝেন, সেটাই ছিল এই ঐতিহ্য।

সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলেন, “যা নিয়ে আমাদের ব্যঙ্গ করত, এখন নিজেরাই সেই পথ নিতে বাধ্য হচ্ছে। বিজেপির উচিত প্রথমে ক্ষমা চাওয়া।” তিনি দাবি করেন, সিপিএম দেরি করেনি। সারা রাজ্যে কর্মীরা নীরবে ত্রাণ সংগ্রহ করছেন, ছবি তুলে প্রচার করার জন্য নয়।

সুজন নিজে ইতিমধ্যে গড়িয়া, কামালগাজি, রাজপুর, হরিনাভি সহ একাধিক এলাকায় পথে নেমে চাঁদা তুলেছেন। রবিবার বিমান বসুকেও কাশীপুর-বেলগাছিয়া এলাকায় বালতি হাতে দেখা গেছে।

তবে সিপিএমের ভিতরের খবর বলছে, আগের মতো সংগঠনের কর্মী সংখ্যা না থাকায় ত্রাণ সংগ্রহের ধাঁচ বদলাতে হয়েছে। আগে দলে দলে পাড়ায় পাড়ায় যেতেন কর্মীরা, এখন একত্রিত হয়ে ব্যস্ত রাস্তায় কর্মসূচি করা হচ্ছে।

বিজেপি অবশ্য ‘বাম পদ্ধতি’ তকমা মানতে নারাজ। সুকান্ত মজুমদার বলেন, “ভারতে সামাজিক উদ্যোগের সময় মানুষ সব সময় এগিয়ে আসে। রামমন্দির নির্মাণই তার প্রমাণ—সরকারি অর্থ ছাড়াই সাধারণ মানুষের চাঁদায় হয়েছে। বামেরা এই পদ্ধতি একসময় গ্রহণ করেছিল কারণ এর চেয়ে কার্যকর কিছু পায়নি। এখন তাদের সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ায় রাস্তায় নামতে পারছে না।”

বিজেপির দাবি, ত্রাণ সংগ্রহে তারা আগে নেমে গিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্দীপনা তৈরি করেছে। সিপিএম এখন সেটা অনুসরণ করতে বাধ্য হচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, উত্তরবঙ্গের এই দুর্যোগ রাজ্যের দুই বড় রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ‘ত্রাণ রাজনীতি’র নতুন মঞ্চ খুলে দিয়েছে। বামদের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে বিজেপির প্রবেশ যেমন নতুন চিত্র, তেমনি এটি আগামী নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ত্রাণের বাক্স আর কৌটো এবার রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হচ্ছে—যেখানে বাম ও গেরুয়া, দুই শিবিরই নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের লড়াইয়ে মাঠে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর