নন্দীগ্রামে টানা ১৫ দিনের ‘সেবাশ্রয়’ শুধু একটি স্বাস্থ্য শিবির নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস, ভরসা এবং মানবিক রাজনীতির এক জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছে। প্রায় ৪৪,৫৪৩ মানুষ এই উদ্যোগের আওতায় এসে আধুনিক ও সম্মানজনক চিকিৎসা পরিষেবা পেয়েছেন—যা স্পষ্ট করে দিয়েছে, লোক দেখানো রাজনীতির বদলে মানুষ বাস্তব পরিষেবাকেই বেছে নিচ্ছেন। এই বিপুল অংশগ্রহণই প্রমাণ করে, বিভেদের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের প্রয়োজন আজ সেবাকেন্দ্রিক মডেল।
এই কর্মসূচির সময়কালে ২৮,১০০ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে, ৩০,২২৯ জন রোগী বিনামূল্যে ওষুধ পেয়েছেন এবং প্রায় ৯৯৩ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বড় হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। প্রতিটি পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে মানুষের আস্থা ও নির্ভরতার গল্প। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘সেবাশ্রয়’ দেখিয়ে দিয়েছে—স্বাস্থ্য পরিষেবা কোনও রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার।
নন্দীগ্রামের দুটি সেবাশ্রয় ক্যাম্পেই ছিল আইসিইউ-সহ অত্যাধুনিক চিকিৎসা পরিকাঠামো। রোগীর ভিড় এতটাই বেড়েছিল যে, একটি ক্যাম্পে ওষুধ বিতরণের জন্য অতিরিক্ত কাউন্টার খুলতে হয়। সংকটজনক রোগীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বহু প্রাণ রক্ষা পেয়েছে বলেই মত চিকিৎসকদের একাংশের।
এই উদ্যোগের প্রভাব নন্দীগ্রামের গণ্ডি ছাড়িয়ে পড়শি এলাকাতেও পৌঁছয়। ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা পেতে এখানে ভিড় জমিয়েছিলেন। এ সময় স্থানীয় বিধায়ক ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী পাল্টা স্বাস্থ্য শিবির করার চেষ্টা করলেও, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের অভাব সেই প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতাই তুলে ধরে। তুলনায়, সেবাশ্রয়ে মানুষের ঢল ছিল চোখে পড়ার মতো।
অনেকের কাছে সেবাশ্রয় হয়ে ওঠে বিপদের সময় শেষ ভরসা। SIR হিয়ারিংয়ে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়া প্রবীণরা তাৎক্ষণিক চিকিৎসা পান এই ক্যাম্পে। ৮ বছরের আরোহী দাস, বিরল Dandy-Walker syndrome-এ আক্রান্ত, কলকাতার অ্যাপোলো হাসপাতালে রেফার হন। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত এক ১১ বছরের কন্যাশিশু জরুরি চিকিৎসা পায় এবং পরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপে NRS হাসপাতালে তার অস্ত্রোপচার হয়। পটাশপুরের কিডনি বিকল রোগী শুভাশীষ শাসমলের ক্ষেত্রে স্ত্রী নিজেই অঙ্গদানে এগিয়ে আসেন—এই মানবিক গল্পগুলোই সেবাশ্রয়ের আসল পরিচয়।


উল্লেখযোগ্যভাবে, সেবাশ্রয়ের সময়কালেই নন্দীগ্রামে দু’টি সমবায় সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং দুটিতেই তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয় আসে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ফলাফলও প্রমাণ করে—মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব পরিষেবার প্রভাব কতটা গভীর।
সবশেষে বলা যায়, সেবাশ্রয়ের সাফল্য কেবল ভিড় বা সংখ্যার নিরিখে মাপা যায় না। এর আসল সার্থকতা মানুষের বিশ্বাস অর্জনে, মানবিকতার জায়গা থেকে পাশে দাঁড়ানোয় এবং রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জীবন বাঁচানোর এক নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াসে।









