বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে নতুন করে কৌশলগত সমীকরণ তৈরি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায়। চিনের প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক ‘হ্যাঙ্গর’ শ্রেণির সাবমেরিন হাতে পাওয়ার পর পাকিস্তান এবার বঙ্গোপসাগরে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করার পরিকল্পনা করছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই নজর রয়েছে ভারতের প্রতিক্রিয়ার দিকেও।
সম্প্রতি পাকিস্তান নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হয়েছে নতুন হ্যাঙ্গর-ক্লাস সাবমেরিন। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় নয়, বরং ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার অংশও হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই হ্যাঙ্গর সাবমেরিন?
‘হ্যাঙ্গর’ নামটি পাকিস্তানের নৌ-ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সাবমেরিন PNS Hangor ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ INS Khukri-কে আঘাত করেছিল। সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে সামনে রেখেই নতুন প্রজন্মের সাবমেরিনের নামকরণ করা হয়েছে।
নতুন সাবমেরিনগুলিকে পাকিস্তান নৌবাহিনীর ভবিষ্যৎ শক্তির অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই শ্রেণির একাধিক সাবমেরিন আগামী কয়েক বছরে তাদের বহরে যুক্ত হতে পারে।
বঙ্গোপসাগর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বঙ্গোপসাগর শুধু একটি জলভাগ নয়, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহণ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার অন্যতম কেন্দ্র। ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলির কৌশলগত স্বার্থ এই অঞ্চলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ফলে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই জলপথ ব্যবহার করে।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা কি নতুন সমীকরণ তৈরি করছে?
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের বঙ্গোপসাগর-কেন্দ্রিক আগ্রহকে অনেকেই নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন।
তবে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরে কোনও দেশের উপস্থিতি মানেই অন্য দেশের জলসীমায় প্রবেশ নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনী চলাচল করতে পারে।
ভারতের অবস্থান কতটা শক্তিশালী?
ভারতের জন্য বঙ্গোপসাগর বহু দশক ধরেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল। বিশাখাপত্তনমে অবস্থিত পূর্ব নৌ-কমান্ড এবং আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলে ভারতের নৌবাহিনীর অবকাঠামো, নজরদারি ক্ষমতা এবং অপারেশনাল উপস্থিতি এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে পাকিস্তানের নতুন সাবমেরিন যোগ হওয়া অবশ্যই নজরকাড়া ঘটনা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন ঘটবে বলে মনে করছেন না অনেক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক।
কী বার্তা দিচ্ছে পাকিস্তান?
পাকিস্তান নৌবাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, নতুন হ্যাঙ্গর সাবমেরিন তাদের দূরবর্তী সামুদ্রিক অঞ্চলে উপস্থিতি বজায় রাখার সক্ষমতা বাড়াবে। পাকিস্তান এটিকে নিজেদের নৌ-শক্তির আধুনিকীকরণের বড় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে।
তবে বাস্তবতা হল, বঙ্গোপসাগর আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ব্যবস্থার অংশ এবং এখানে উপস্থিতি বজায় রাখতে শুধু সাবমেরিন নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, অবকাঠামো, মিত্রতা এবং ধারাবাহিক সামরিক সক্ষমতা।
এই পরিস্থিতিতে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত প্রতিযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পাকিস্তানের নতুন সাবমেরিন কর্মসূচি কতটা বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারে এবং ভারত কীভাবে তার সামুদ্রিক কৌশল আরও শক্তিশালী করে, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।



