বনগাঁ থেকে ফেরার পথে ভয়াবহ উত্তেজনার মুখে পড়ল মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়। বারাসত মর্গ-কাণ্ড ঘিরে ক্ষোভে ফেটে পড়া মানুষজন যশোর রোডে বারাসত মেডিক্যাল কলেজের সামনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়িবহরকে ঘিরে ধরে। অভিযোগ—সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩৪ বছর বয়সি প্রীতম ঘোষের দেহের একটি চোখ মর্গে থাকা অবস্থায় খুবলে নেওয়া হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে আসতেই হাসপাতাল চত্বরে শুরু হয় বিক্ষোভ, যার প্রভাবে প্রায় ১৫ মিনিট আটকে থাকে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়।
ঘটনার জেরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে বারাসত মেডিক্যাল কলেজের মূল গেটে। স্থানীয় সূত্রের খবর, দুপুর থেকেই মৃতের পরিবার এবং প্রতিবেশীরা হাসপাতালের অব্যবস্থার প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। বিকেলের দিকে যশোর রোড অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ঠিক সেই সময় বনগাঁ থেকে কলকাতায় ফিরছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়া বিক্ষোভকারীদের সামনে নেমে এসে তিনি নিজেই আলোচনা শুরু করেন—এমন দৃশ্য সাম্প্রতিক সময়ে খুব কমই দেখা গেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধৈর্য ধরে শোনেন মৃত যুবকের পরিবারের অভিযোগ। পরিবারের দাবি, দুর্ঘটনার পরে প্রীতমকে বারাসত মেডিক্যালে আনা হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু পরে যখন দেহ নিতে আসেন, তখন তারা দেখেন এক চোখ নেই। এই অভিযোগেই ফুঁসে ওঠে পরিবার। আর সেই অবস্থাতেই মুখ্যমন্ত্রীকে আটকে ধরে বিক্ষোভকারীরা ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
বারাসত মর্গে চোখ খুবলে নেওয়ার অভিযোগে বিক্ষোভ, মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় আটকে রইল ১৫ মিনিট

মুখ্যমন্ত্রী ঘটনাস্থলেই জানান, বারাসত মর্গ-কাণ্ড অত্যন্ত “দুর্ভাগ্যজনক”। তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের নির্দেশ দেন এবং পরিষ্কার জানান—দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, প্রীতমের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে তিনি জানিয়ে দেন, যেহেতু মৃত যুবক পরিবারের একমাত্র রোজগেরে ছিলেন, তাই তাঁর মাকে সরকারি চাকরি দেওয়া হবে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রীতম ঘোষ বারাসতের ১ নম্বর রেলগেটের কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। হাসপাতালে আনার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ—মর্গে রেখে দেওয়া দেহের একটি চোখ খুবলে নেওয়া হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনো কোনও সরকারি বিবৃতি দেয়নি।
পরিস্থিতি প্রথমে উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও মমতার হস্তক্ষেপে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। অবরোধ তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যশোর রোডে ফের যাতায়াত শুরু হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি এসে কথা বলার ফলে উত্তেজনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বারাসত মর্গ-কাণ্ড শুধু হাসপাতালের নিরাপত্তা বা চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরই প্রশ্ন তোলে না, বরং দেহব্যবস্থাপনাকে ঘিরে ভয়াবহ বাস্তবতাকেও সামনে আনে। বছরভর রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে মর্গে দেহ অব্যবস্থাপনা, না জানা কারণে অঙ্গ হারানো, দেহ বদলের মতো অভিযোগ উঠে এসেছে। এই ঘটনার পরে সেই বিতর্ক আবারও মাথাচাড়া দিচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে এখন তদন্ত শুরু হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবির মূল জায়গা ছিল—দোষীদের দ্রুত শাস্তি। তাদের অভিযোগ, হাসপাতালের ভেতরের অনিয়ম দীর্ঘদিনের, এবং তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিরাপত্তাহীন মর্গে কীভাবে এমন ঘটনা ঘটতে পারে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অন্যদিকে, প্রশাসনের দাবি—মুখ্যমন্ত্রী নিজে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। তবে কীভাবে মৃত যুবকের চোখ হারিয়ে গেল, তা কি দুর্ঘটনার সময়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল না কি সত্যিই মর্গে কোনও অপরাধ হয়েছে—সবটাই এখন নির্ভর করছে মেডিক্যাল ও ফরেনসিক তদন্তের রিপোর্টের ওপর।
সব মিলিয়ে, বারাসত মর্গ-কাণ্ড শুধু একটি হাসপাতাল-সংক্রান্ত অভিযোগ নয়—এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং মৃতদেহের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব—এই সবকিছুকেই বড় প্রশ্নে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আর মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় আটকে যাওয়া এই ঘটনার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।







