সাধারণ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মাত্রা নিল। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের পার্টি অফিস ভাঙতে নামানো হয় বুলডোজ়ার, আর ঢাকায় হামলার শিকার হয় সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।
ঢাকার কারওয়ান বাজারে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দেশের প্রথম সারির দুই সংবাদপত্র—‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য ডেলি স্টার’-এর দফতরে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন লাগানো হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর রাত প্রায় ২টো নাগাদ ভিতরে আটকে থাকা সাংবাদিকদের উদ্ধার করা হয়। তবে ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক। ‘প্রথম আলো’-র চারতলা ভবনটি কার্যত সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। শুক্রবার সকালেও ধোঁয়া উঠতে দেখা গিয়েছে। এই ঘটনার জেরে দুই সংবাদপত্রেরই মুদ্রিত সংস্করণ শুক্রবার প্রকাশিত হয়নি।
একই রাতে ধানমন্ডিতে সঙ্গীতশিল্পী সন্জীদা খাতুন প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ‘ছায়ানট’-এর সাততলা ভবনের বিভিন্ন কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, একের পর এক কক্ষে ঢুকে আসবাব ও সরঞ্জাম নষ্ট করা হয়েছে।
রাজশাহীতে পরিস্থিতি আরও তীব্র আকার নেয়। সেখানে আওয়ামী লীগের একটি পার্টি অফিস গুঁড়িয়ে দিতে বুলডোজ়ার ব্যবহার করা হয়। এর পাশাপাশি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির বাড়ি ও সংগ্রহশালাতেও ফের ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার সকালেও কয়েকজনকে ইট দিয়ে অবশিষ্ট দেওয়াল ভাঙতে দেখা যায়।
এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমাজমাধ্যমে এক পোস্টে দাবি করেন, সাম্প্রতিক নৈরাজ্যের নেপথ্যে ‘দুষ্কৃতীদের অপতৎপরতা’ রয়েছে এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড সেই চেষ্টারই অংশ। একই সঙ্গে সংবাদপত্রের অফিসে হামলার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি করেন তিনি।
অন্য দিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও দেশবাসীর উদ্দেশে সংযম ও ধৈর্য বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছে। দলের নেতা শফিকুর রহমান সমাজমাধ্যমে লেখেন, দেশের স্বার্থে সকলের শান্ত থাকা জরুরি।
এদিকে, আওয়ামী লীগের সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে ভাঙচুরের ভিডিও-সহ একাধিক পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার, এনসিপি এবং উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলির দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মুখ শরিফ ওসমান হাদি গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হলেও বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযোগ, এই হামলায় আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের এক কর্মী জড়িত। হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে বিক্ষোভ তীব্র হয়।
পরিস্থিতির আঁচ পেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে শান্তি ও সংযমের আবেদন জানান। তবে রাতভর ঘটে যাওয়া ঘটনায় স্পষ্ট, সেই আবেদন বাস্তবে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি।



