ভাষা দিবসের পাশাপাশি ছুটির তালিকা থেকে বাদ সরস্বতী পুজো, জন্মাষ্টমী! মৌলবাদীদের দখলে বাংলাদেশ

২০২৬ সালের ছুটির তালিকায় নেই ভাষা শহীদ দিবস, সরস্বতী পুজো ও জন্মাষ্টমী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি ঘিরে বাংলাদেশে তীব্র বিতর্ক।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে ভাষার আবেগেই একদিন একজোট হয়েছিল বাঙালি। সেই ইতিহাসের নাম—অমর একুশে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু রাষ্ট্রভাষার দাবি নয়, বাঙালির আত্মপরিচয়ের লড়াই। কিন্তু সেই অমর একুশের স্মৃতিকে মুছে দেওয়ার ষড়যন্ত্রই কি শুরু হয়েছে বাংলাদেশে? ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকা প্রকাশ হতেই সে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। কারণ, একসঙ্গে একাধিক ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দিনের ছুটি বাতিলের অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ-এর অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে।

২০২৬ সালের জন্য প্রকাশিত ছুটির তালিকায় নেই ২১ ফেব্রুয়ারি—ভাষা শহীদ দিবস। এই অনুপস্থিতি নিয়েই যখন দেশজুড়ে বিতর্ক তুঙ্গে, তখন সামনে এসেছে আরও বিস্ফোরক তথ্য। জানা যাচ্ছে, ওই একই ছুটির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে সরস্বতী পুজো, জন্মাষ্টমী এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবসের ছুটিও। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশের মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য এই ছুটির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।

ভাষা শহীদ দিবসের ছুটি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। আগের স্টোরিতে যেমন উল্লেখ করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি শনিবার পড়েছে—যা বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সেই যুক্তিতে আলাদা করে দিনটির উল্লেখ করা হয়নি বলে প্রশাসনের একাংশ দাবি করছে। কিন্তু একই যুক্তিতে অতীতে কখনও ভাষা শহীদ দিবসের নাম বাদ দেওয়া হয়নি। বরং সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে সরকারি ছুটির তালিকায় ২১ ফেব্রুয়ারির উল্লেখ থাকত। ২০২৫ সালেও শুক্রবার পড়লেও দিনটি সরকারি ছুটি হিসেবেই তালিকাভুক্ত ছিল।

এবার শুধু ভাষা শহীদ দিবস নয়, সরস্বতী পুজো ও জন্মাষ্টমীর মতো হিন্দু ধর্মীয় উৎসবের ছুটি বাদ পড়ায় বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এটি কি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, না কি একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্রতিফলন? অনেকেই অভিযোগ করছেন, মহম্মদ ইউনুস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে এবং মৌলবাদী শক্তির প্রভাব বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এই ছুটির তালিকা শুধু ক্যালেন্ডারের বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের মূল্যবোধের দিকনির্দেশও বহন করে। ভাষা শহীদ দিবস যেমন বাঙালি জাতিসত্তার ভিত্তি, তেমনই সরস্বতী পুজো ও জন্মাষ্টমী দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। সেই ছুটিগুলি একসঙ্গে বাদ পড়া নিছক কাকতালীয় নয় বলেই মনে করছেন সমালোচকরা।

এই বিতর্কের মাঝেই উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক বাস্তবতা হল—আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচন ও ফলপ্রকাশের আগেই ছুটির তালিকা ঘিরে এই সিদ্ধান্ত জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এখনও পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ছুটি বাতিলের কারণ নিয়ে স্পষ্ট কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

ভাষা আন্দোলনের শহিদদের রক্তে লেখা ইতিহাস থেকে শুরু করে ধর্মীয় সহাবস্থানের দীর্ঘ ঐতিহ্য—সবকিছুর মাঝেই এখন প্রশ্ন একটাই: বাংলাদেশ কি তার মূল চেতনা থেকে সরে যাচ্ছে? ২০২৬ সালের ছুটির তালিকা ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক যে শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বহন করছে, তা বলাই বাহুল্য।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত