বিধানসভা ভোটের আগে সিপিএম বড় জোর দিয়ে শুরু করেছে বাংলা বাঁচাও যাত্রা। লক্ষ্য রাজ্য জুড়ে সংগঠনের পুনর্গঠন, জনসংযোগ বাড়ানো এবং নতুন করে রাজনৈতিক আবহ তৈরি। কিন্তু শুরুতেই উঠছে প্রশ্ন—এই বাংলা বাঁচাও যাত্রা আদৌ কি সিপিএমকে ‘বাঁচাতে’ পারবে?
তৃণমূল কংগ্রেস যে ধাঁচে নবজোয়ার যাত্রা চালিয়ে রাজ্যে নতুন জনআবহ তৈরি করেছিল, সিপিএমও যেন সেই পথেই হেঁটেছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতোই মহম্মদ সেলিম ও মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায় কোচবিহার থেকে পদযাত্রার সূচনা করেন। কিন্তু ছবি মিললেও পরিবেশ মিলছে না। কোথাও নেই তৃণমূলের মতো জনস্রোত বা দৃশ্যত চমক। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন বাড়ছে—কেন এই সাড়া মিলছে না?
কোচবিহারের তুফানগঞ্জ থেকে যাত্রা শুরু হতেই স্থানীয় নেতৃত্ব স্বীকার করেছেন, প্রত্যাশিত উদ্দীপনা দেখা যায়নি। যেখানে আগে পঞ্চায়েত কিংবা লোকসভা ভোটের সময় প্রচারে যুব নেতাদের আগ্রাসী অংশগ্রহণ দেখা যেত, সেখানে বাংলা বাঁচাও যাত্রায় তারা তেমন উপস্থিত নন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে কিছু পুরোনো নেতা-কর্মী লাল পতাকা নিয়ে হাঁটছেন। যে নিচুতলার উন্মাদনা সংগঠনকে চাঙ্গা করার কথা, তা-ও অনুপস্থিত।
‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’ কি বদলে দেবে সিপিএমের ভাগ্য? প্রশ্ন বাড়ছে অন্দরে
অন্যদিকে, সেলিম ও মিনাক্ষী দাবি করেছেন—মানুষ তাঁদের সমর্থন করছেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন গল্প। আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি—সব জায়গাতেই ভিড় একইভাবে কম। বাইকের মিছিলও কার্যত প্রতীকী। স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বলছেন, ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ ছুটে যেতেন। সেই আবেগ সিপিএম এখনও তৈরি করতে পারেনি, বরং ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে।
দলের অন্দরে অনেকে এই কর্মসূচিকে পরিকল্পনার দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ বলছেন। তৃণমূল নবজোয়ার যাত্রার আগে রাজ্যজোড়া প্রস্তুতি নিয়েছিল। বুথ সংগঠনকে রীতিমতো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল যাতে ঘরে ঘরে পৌঁছানো যায়। সিপিএম সে পথে হাঁটেনি। বরং পরীক্ষার আগের রাতে সিলেবাস শেষ করার মতো তড়িঘড়ি করে কর্মসূচি শুরু হয়েছে বলেই মনে করছেন বহু কর্মী।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সিপিএমের নীতিপঙ্গুত্বও এখন বড় সমস্যা। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হবে কি না—স্পষ্ট নয়। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই জোরালো হবে নাকি কংগ্রেসকেই প্রতিপক্ষ ধরা হবে—এমন মৌলিক বার্তাও নিচুতলার কর্মীরা পাচ্ছেন না। ফলে বিভ্রান্তি বাড়ছে। যে কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি সফল করতে মতাদর্শগত স্পষ্টতা জরুরি; সেই জায়গায় সিপিএমের ঘাটতি প্রকট।

এছাড়া, এসআইআর বিতর্কের সময় তৃণমূল যে ভাবে বুথে বুথে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, সমস্যার কথা শুনেছে—তা জনসমর্থন পেয়েছে। সিপিএমের বুথকর্মীদের বড় অংশ সেই কাজ সামলাতে পারেননি। উপরন্তু, একদিকে সংগঠনের নির্দেশ, অন্যদিকে এসআইআর নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়—কোনটা আগে সামলাবেন তা নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
এতকিছুর পরও সিপিএম বলছে, এই যাত্রা সংগঠনকে নতুন করে চাঙ্গা করবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—১১টি জেলা পার করলেই কি সংগঠনের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব? যেসব জেলায় সিপিএমের সংগঠন সবচেয়ে দুর্বল, যেমন—দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর বা কলকাতা—সেইসব জায়গাকে বাদ দেওয়া কি সঠিক সিদ্ধান্ত?
পূর্ব মেদিনীপুরের এক প্রবীণ সিপিএম নেতা বলছেন, দুর্বল অঞ্চলে না গেলে জনআস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। যেখানেই সংগঠন শক্তিশালী, শুধু সেখানেই কর্মসূচি করলে রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলানো যাবে না।
রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট, বাংলা বাঁচাও যাত্রা এখন সিপিএমের কাছে শুধু কর্মসূচি নয়—রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—এই যাত্রা কি সত্যিই সিপিএমকে নতুন করে জনমনে জায়গা করে দেবে, নাকি এটি আরেকটি ব্যর্থ কর্মসূচির তালিকায় নাম লেখাবে?
সময়ই তার উত্তর দেবে।







