আবাস যোজনায় যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও যাঁরা বাড়ি তৈরির টাকা পেয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের বার্তা দিলেন রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। রবিবার কোচবিহারে প্রশাসনিক বৈঠকের আগে মন্ত্রী জানান, এমন উপভোক্তাদের নোটিস পাঠানো হবে এবং অযোগ্য হিসেবে প্রমাণিত হলে পাওয়া সরকারি অর্থ ফেরত দিতে হতে পারে।
দিলীপের বক্তব্য, আবাস যোজনায় নতুন করে বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে। সেই আবেদনগুলির যাচাই বা ভেরিফিকেশন হবে। যাচাইয়ের ধাপ সম্পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যোগ্য প্রাপকদের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া এগোবে। কোচবিহার জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক নথিতেও আবাস প্লাস ২০২৪ সমীক্ষার তথ্য যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন দফতরের আধিকারিকদের নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি রয়েছে।
৫৫ লক্ষ আবেদনের ভেরিফিকেশন
মন্ত্রী জানিয়েছেন, আবাস যোজনায় প্রায় ৫৫ লক্ষ নতুন আবেদন এসেছে। সেই আবেদনগুলির মধ্যে কারা প্রকৃতপক্ষে বাড়ি তৈরির সহায়তা পাওয়ার যোগ্য, তা যাচাই করা হবে।
দিলীপের কথায়, যাচাই যতটা এগোবে, সেই অনুযায়ী যোগ্য উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হবে। অর্থাৎ আবেদন করলেই টাকা পাওয়া যাবে না; প্রশাসনিক যাচাইয়ের পরেই সুবিধা দেওয়ার প্রক্রিয়া এগোবে।
আবাস প্লাস সমীক্ষার ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই ও উপভোক্তা বাছাইয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাতেও আধারভিত্তিক e-KYC, জিও-ট্যাগ করা ছবি, ফিজিক্যাল ইন্সপেকশন এবং অডিটের মতো একাধিক যাচাই পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে।
‘অযোগ্য’ উপভোক্তাদের নোটিস
যাঁরা ইতিমধ্যেই আবাস যোজনার টাকা পেয়েছেন, কিন্তু পরে যাচাইয়ে তাঁদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন দিলীপ।
মন্ত্রী জানান, অযোগ্য উপভোক্তাদের নোটিস দেওয়া হবে। প্রশাসনিক তদন্তে তাঁরা প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না বলে প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়াও শুরু করা হবে।
তবে কোনও নির্দিষ্ট উপভোক্তা অযোগ্য কি না, তা যাচাই ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়। তাই অভিযোগ বা সন্দেহের ভিত্তিতেই কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে—এমনটা নয়।
আবাস ও ১০০ দিনের কাজ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ
পূর্বতন তৃণমূল সরকারের সময় আবাস যোজনা এবং ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন দিলীপ ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, এই অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে অডিটের কাজ চলছে।
যে সব গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে বেশি অভিযোগ এসেছে, সেখানে বিশেষ অডিট করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা আধিকারিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
পূর্বতন সরকারের পাশাপাশি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক অভিযোগ তোলেন দিলীপ। তবে এই অভিযোগগুলি তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য; এর সত্যতা সম্পর্কে স্বাধীন ভাবে কোনও সিদ্ধান্ত এই প্রতিবেদনে দেওয়া হচ্ছে না।
১৫ দিন প্রধান না এলেই প্রশাসক?
রবিবারের প্রশাসনিক বৈঠকের পর পঞ্চায়েতের পরিচালনগত সমস্যা নিয়েও মুখ খোলেন দিলীপ। তাঁর বক্তব্য, কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সেই সমস্যাগুলি দ্রুত মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মন্ত্রী জানান, যে সব গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রধান ১৫ দিন ধরে অনুপস্থিত, সেখানে প্রশাসক বসানোর ব্যবস্থা করা হবে। পঞ্চায়েতের কাজ যাতে কোনও ব্যক্তির অনুপস্থিতির কারণে থমকে না থাকে, সেটিই এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য বলে জানান তিনি।
এর আগে পাহাড়ের পঞ্চায়েত এলাকাতেও অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে বিশেষ অডিটের কথা জানিয়েছিলেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী। দার্জিলিং ও কালিম্পং-সহ পাহাড়ি এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজের অগ্রগতি নিয়েও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে আবাস যোজনায় উপভোক্তা বাছাই, পুরনো অনিয়মের অডিট এবং পঞ্চায়েতের প্রশাসনিক অচলাবস্থা—তিনটি বিষয়েই কড়া অবস্থানের বার্তা দিলেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী। এখন নজর, যাচাইয়ের পরে কত জন উপভোক্তার ক্ষেত্রে অনিয়ম ধরা পড়ে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।



