পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ নাই হতে পারেন কিন্তু তিনি যে অভিজ্ঞ বিচারপতি সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। দীর্ঘদিনের একটা আদালত জীবন। আচমকা অবসর না নিলেও সে জীবনের মেয়াদ আর খুব বেশিদিন ছিল না। জানেন, রাজনীতির ময়দান কতটা অনিশ্চিত। ফলে তিনি যে খুব ধাপে ধাপে পা ফেলবেন সেটাই কাঙ্খিত। তাই রবিবারের যাবতীয় বক্তব্যের মধ্যে শুধুই ছিল অবসর নেওয়ার বিষয় এবং রাজনীতিতে প্রবেশ করার একটা দৃঢ় ভাবনা। কিন্তু রাজনীতি তো আর ব্যক্তিগতভাবে হবে না, সেজন্য প্রয়োজন সংবিধান স্বীকৃত একটি দল। হ্যাঁ, নির্দল বা নিজের তৈরি করার দলের প্রতিনিধিত্ব করতেই পারেন। কিন্তু সেক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন থাকতেই পারে, নিজে দল যারাই করেছেন তাঁরা বেশিরভাগই পূর্বাশ্রম জীবনে অন্য কোন না কোনও দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে বিষয়টা সেরকম নয়।
কিন্তু, কেন রাজনীতিতে আসতে চাইছেন অভিজিৎ? এখনও পর্যন্ত যেটা যুক্তিটা সবার প্রথমে আসছে, তা কিন্তু চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ এই যে দীর্ঘ একটা সময় ধরে তিনি শাসক দলের বিরুদ্ধে কথা বলছেন এবং সেই কথার প্রত্যুত্তরে তাঁকে যে রাজনৈতিক ময়দানে এসে লড়াই করার আহ্বান দেওয়া হচ্ছে, সেই আহ্বানকে এড়িয়ে না গিয়ে স্বীকৃতি দিচ্ছেন তিনি। দ্বিতীয় বিষয়টা, তাঁর যে সমাজদর্শন এবং সততা। তিনি যে ভালো মানুষ সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, কারণ, বেশকিছু প্রমাণ সামনেই রয়েছে। মানুষের বক্তব্যে আছেন তিনি। জীবনেও। সেই সহানুভূতিশীল মন থেকে বর্তমান রাজনীতিতে প্রবেশ এবং দলগত বশ্যতাকে স্বীকার করা, তা একটা সময় পড়ে অধৈর্য্য করে দেবেন না তো মিস্টার গঙ্গোপাধ্যায়কে? কারণ, তাঁর মতো মানুষের কাছে হয়তো স্বাধীনতাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্বাধীনতা এজলাসে তিনি যতটা পাতেন, সমাজের বিচারপতি হতে পারবেন কি তখন? কোথাও গিয়ে একটা ক্ষমতা হারাবেন তো বটেই। আইনের ক্ষমতা রাজনীতির থেকেও কয়েকগুণ বড়।


সামনেই লোকসভা নির্বাচন। আর একেবারে মার্চ মাসের গোড়া থেকেই রাজনৈতিক মহলে নানান রকম ইস্যু তৈরি হচ্ছে। অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ও এই মেগা ভোটের আগে রাজনীতিতে প্রবেশ করার কথা ঘোষণা করলেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কি শুধুমাত্রই আসন্ন নির্বাচনের কথা ভেবে রাজনীতিতে আসছেন নাকি রয়েছে আরও কোনও ‘বৃহত্তর’ লক্ষ্য? কারণ, এই লোকসভা নির্বাচনে তিনি ভোটে জিতে কোনও দলের হয়ে সংসদে খুব আধুনিকভাবে দারুণ দারুণ বক্তব্য রাখতেই পারেন। কিন্তু একজন নেতা বা নেত্রীর মতো সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন কি? তিনি যে সমাজের স্বপ্ন দেখছেন বা যে ধরনের দুর্নীতির মোকাবেলা করবেন বলে ভাবছেন বা করে আসছেন, তা কিন্তু সরাসরি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে। তাঁর মূল যে দর্শনের তফাৎ তা কোথাও গিয়ে সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের সঙ্গে। এই জীবনধারা, এই শাসনের প্রতি তাঁর যেন একটা তীব্র আপত্তি রয়েছে। ফলত, সেক্ষেত্রে রাজ্যের যে নির্বাচন অর্থাৎ বিধানসভা নির্বাচনে অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো মানুষদের ভূমিকা অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক বলেই মনে হয়।
এই লোকসভা নির্বাচন দেশের মানুষের স্বার্থে নির্বাচন। বাংলার রাজনীতিতে তার প্রভাব পড়লেও ক্ষমতা বদল এক্ষুনি হচ্ছে না। তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও আড়াই বছর। সদ্য ২১ সালে ক্ষমতায় এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস। অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বিচক্ষণ মানুষ নিশ্চয়ই জানেন যে, রাজনীতিতে এসে তিনি নিজস্ব জনপ্রিয়তায় দু’মাসের মধ্যে কোনও একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত সদস্য হয়ে ভারতীয় সংবিধান রক্ষার ক্ষেত্রে এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন ঠিকই। কিন্তু তিনি যে মূল্যবোধের লড়াইয়ের কথা বলছেন, যে আদর্শকে স্থাপন করার কথা বলছেন, তার জন্য প্রয়োজন, সিস্টেমে একটা বদল। একটা আদর্শের বদল। একটা জীবনযাপনের বদল। দৃষ্টিভঙ্গির বদল।



এই বদল কোনভাবেই বিজেপি কংগ্রেস বা সিপিএমের সঙ্গে থেকে কতটা বাস্তবায়িত হতে পারে তা নিয়ে নানামুখী মত তৈরি করা যেতেই পারে। কিন্তু বশ্যতা স্বীকার করতেই হবে। অন্য দলের প্রতিটি মানুষের সঙ্গে আপোস করে থাকতে হবে। ঠিক যেমন দলের দুর্নীতির ভার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নেন। দলগত রাজনীতিতে আরও অনেক রকম চাল থাকে। নীরবতা থাকে। তবে, সরকার চালানো যায়। ব্যক্তি হিসাবে যতটা প্রভাব তিনি রাখতেন, দলগত রাজনীতিতে তা ক্ষুণ্ণ হওয়াই স্বাভাবিক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের পরিবর্তন করতে প্রয়োজন সাংগঠিক জোর। সব দল কি তাঁকে সেই জোর দিতে পারবে?
আসল কথাটা হল, অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় রাজনীতির উর্ধ্বে নন, রাজনীতিতে তিনি এলেই এক লহমায় সব পরিবর্তন হয়ে যাবে তাও নয়। তাঁর চিন্তা সঠিক, দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক। আর সেটাও এসেছে তাঁর পেশা থেকে। একজন আইনের লোক তো আর অসৎ হতে পারেন না! ফলে, রাজনীতিতে এলে রাজনীতিকেও চিনতে হবে অভিজিৎকে। মাটির গন্ধ, মানুষের গন্ধ হয়তো তিনি চেনেন, কিন্তু প্রতিরোধ আর প্রতিবাদের রাজনীতি থেকেই জন্ম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের, সেই লড়াই খুব সহজ হবে না, তাই কি দু’বছরের একটি প্রস্তুতিতে নামলেন অভিজিৎ?








