নজরবন্দি ব্যুরো: অসম-অরুণাচল প্রদেশ সীমান্তে সোমবার নতুন করে উত্তেজনা ছড়াল। সীমান্তবর্তী মিংমাং বস্তি (Mingmang Basti) এলাকায় জমি দখল বা অনুপ্রবেশের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘাতের মধ্যে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ। ঘটনায় অন্তত ১৮ জন অসমের বাসিন্দা আহত, তাঁদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ডিব্রুগড় মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে (Dibrugarh Medical College and Hospital) পাঠানো হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত সীমান্তবর্তী এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধ থেকে বলে প্রাথমিক ভাবে জানা যাচ্ছে। অভিযোগ, অরুণাচল প্রদেশের দিক থেকে আসা অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনের সঙ্গে স্থানীয়দের বচসা ও সংঘাত শুরু হয়। পরিস্থিতি ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে গুলি চলার ঘটনা ঘটে। তবে গুলি চালানো ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ঘটনার সম্পূর্ণ পটভূমি এখনও তদন্তাধীন।
আহতদের প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে আহতের সংখ্যা নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে ভিন্ন তথ্য সামনে এলেও সর্বশেষ প্রতিবেদনে মোট ১৮ জন আহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা যাচ্ছে।
ঘটনার পর মিংমাং বস্তি এবং সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য অসম পুলিশের অতিরিক্ত বাহিনী ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুই রাজ্যের প্রশাসনের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma) জানিয়েছেন, দুই রাজ্যের মুখ্যসচিব পর্যায়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি দুই রাজ্যের ডিজিপি-ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বয় করছেন।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বক্তব্য, এখন প্রথম লক্ষ্য পরিস্থিতির উত্তেজনা কমানো এবং সীমান্তে শান্তি ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে তিনি অসম পুলিশের উদ্দেশে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন—রাজ্যের এক ইঞ্চি জমিও কোনও ভাবেই ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
অসমের মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, অসম ও অরুণাচল প্রদেশের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। দুই রাজ্যের সীমান্তের বেশ কিছু অংশ এখনও সংবেদনশীল হিসেবে পরিচিত। জমির অধিকার, বসতি এবং তথাকথিত অনুপ্রবেশের অভিযোগকে কেন্দ্র করে মাঝেমধ্যেই স্থানীয় স্তরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
দুই রাজ্যই অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছে। সীমান্ত চিহ্নিতকরণ এবং স্থানীয় বিরোধ মেটাতে প্রশাসনিক স্তরে একাধিক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কিছু এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধ এখনও পুরোপুরি মেটেনি। সোমবারের ঘটনাই ফের সেই পুরনো সমস্যাকে সামনে নিয়ে এল।
এখানে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, একটি স্থানীয় জমি-বিরোধ কী ভাবে মুহূর্তের মধ্যে আন্তঃরাজ্য উত্তেজনায় পরিণত হতে পারে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সাধারণ মানুষের বসবাস, কৃষিজমি এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন সরাসরি জড়িত থাকায় সামান্য সংঘর্ষও দ্রুত বড় আকার নিতে পারে।
ঘটনায় কারা গুলি চালিয়েছে, কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ কী—এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তাই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অসম সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি শান্ত রাখার পাশাপাশি রাজ্যের জমির অধিকার রক্ষার বার্তা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সীমান্ত এলাকায় যাতে প্রতিশোধমূলক সংঘর্ষ বা নতুন করে উত্তেজনা না ছড়ায়, তার জন্য দুই রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দশকের পর দশক ধরে চলে আসা অসম-অরুণাচল সীমান্ত বিরোধের প্রেক্ষাপটে সোমবারের গুলির ঘটনা নিছক স্থানীয় সংঘর্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ১৮ জনের আহত হওয়ার ঘটনা এবং চারজনের সংকটজনক অবস্থার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আলোচনার টেবিলে চলা সীমান্ত সমাধানের প্রক্রিয়া কত দ্রুত মাটির স্তরে কার্যকর হবে। কারণ সীমান্তের মানুষ নিরাপদ না থাকলে কোনও প্রশাসনিক সমঝোতাই পূর্ণ অর্থে সফল হতে পারে না।



