বীরভূমের রামপুরহাটে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ashis Banerjee) অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। রবিবার সকালে তাঁর বাড়ি লাগোয়া দলীয় কার্যালয় থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতে লেখা চিঠিও পাওয়া গিয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। চিঠিতে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে আক্ষেপের কথা লেখা রয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। তদন্তের পাশাপাশি ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় পুলিশ।
রামপুরহাট শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাটতলাপাড়ায় বাড়ি আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তাঁর বাড়ির পাশেই ছিল দলীয় কার্যালয়। রবিবার সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা ওই কার্যালয়ে তাঁকে দেখতে পান বলে জানা গিয়েছে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া চিঠিটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চিঠিতে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেখানে তাঁর দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কোনও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এবং কোনও কাজের বিনিময়ে অর্থ নেননি। একইসঙ্গে তাঁকে হেয় বা ফাঁসানোর চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েও আক্ষেপের কথা লেখা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে চিঠিটির লেখক, সময় এবং প্রেক্ষাপট-সহ সবকিছুই তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
চিঠিতে নিজের ছাত্রজীবন এবং রাজনৈতিক জীবনের কথাও উল্লেখ করেছেন আশিস। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সময়েও কোনও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হননি। রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও তা কখনও ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হয়নি বলেও তিনি লিখেছেন। পাশাপাশি দলের নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি থাকলেও সবসময় প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারেননি—এমন কথাও চিঠিতে রয়েছে বলে খবর।
সাম্প্রতিক সময়ে বীরভূমের রাজনীতিতে দুর্নীতি সংক্রান্ত নানা অভিযোগ ও তদন্তের আবহ তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠির বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ বা তদন্তের সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও তদন্তকারীদের তরফে নিশ্চিত করা হয়নি। পুলিশও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি।
মৃত্যুর আগের দিনও আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কয়েকজন দলীয় নেতা-কর্মীর দেখা হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি। শনিবার রাতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই সময় কাটিয়েছিলেন বলেও জানা যাচ্ছে। ফলে রবিবার সকালে তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই এলাকায় শোকের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের পরেই।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রামপুরহাট আসন থেকে ফের তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে বিজেপির ধ্রুব সাহার কাছে পরাজিত হন তিনি। নির্বাচনের পর তাঁকে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। এর কিছুদিন পর বীরভূম জেলা তৃণমূলের কোর কমিটির চেয়ারম্যানের পদ থেকেও সরে দাঁড়ান তিনি বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবনে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচিতি ছিল রামপুরহাটের প্রবীণ তৃণমূল নেতা হিসেবে। অধ্যাপনা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা আশিস বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা ও পিএইচডি সম্পূর্ণ করার পর রামপুরহাট কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন। ২০০১ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকার পর তিনি পূর্ণ সময়ের রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু কংগ্রেসের হাত ধরে। রামপুরহাট বিধানসভা কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবেও নির্বাচনে লড়েছিলেন তিনি। পরে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়ে ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রামপুরহাট থেকে প্রথমবার জয় পান। বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের সময়ও নিজের কেন্দ্র ধরে রাখতে সক্ষম হন তিনি। ২০০৬ সালেও রামপুরহাট থেকে জয়ী হন আশিস।
এরপর ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও একই কেন্দ্র থেকে জয় পান তিনি। অর্থাৎ রামপুরহাটের বিধায়ক হিসেবে টানা পাঁচটি নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। এই দীর্ঘ নির্বাচনী সাফল্য তাঁকে বীরভূমের রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ করে তোলে।
২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দফায় মন্ত্রিসভায় জায়গা না পেলেও ২০১৪ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) মন্ত্রিসভায় যোগ দেন আশিস। আয়ুর্বেদ, যোগ, ন্যাচারোপ্যাথি, ইউনানি, সিদ্ধ ও হোমিওপ্যাথি দফতরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি দফতরের দায়িত্ব সামলান। ২০১৭ সালে কৃষি দফতরের দায়িত্বও তাঁর হাতে আসে।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফের জয়ী হওয়ার পর আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনে আরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। ওই বছর ২ জুলাই তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হন। ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত এই সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। একইসঙ্গে বীরভূমে তৃণমূলের সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন প্রবীণ এই নেতা।
বীরভূমের তৃণমূল রাজনীতিতে অনুব্রত মণ্ডল (Anubrata Mondal)-সহ একাধিক নেতার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। ২০২২ সালের বগটুই-কাণ্ডের পর জেলার সংগঠন ও দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের মধ্যেও তাঁর নাম সামনে আসে। তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আশিসকে দলের অপেক্ষাকৃত প্রবীণ ও অভিজ্ঞ মুখ হিসেবেই দেখা হয়েছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা অনেকটাই বদলে যায়। যে রামপুরহাট কেন্দ্র থেকে পাঁচবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেখানেই এবার বিজেপির প্রার্থীর কাছে হারের মুখ দেখতে হয় তাঁকে। সেই রাজনৈতিক পালাবদলের কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যু সামনে এল। ফলে ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তদন্ত। উদ্ধার হওয়া চিঠির সত্যতা, মৃত্যুর আগে সেটি লেখা হয়েছিল কি না, মৃত্যুর পরিস্থিতি এবং অন্য কোনও কারণের সম্ভাবনা—সবদিকই খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং তদন্তের পরই আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাবে। তার আগে কোনও নির্দিষ্ট কারণ বা অভিযোগকে মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা সমীচীন নয়।



