জলপাইগুড়িতে বিজেপিকে হটাতে ‘সাতে সাত’, টার্গেট বেঁধে দিলেন অভিষেক

লোকসভায় ভরাডুবির পর জলপাইগুড়ি ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া তৃণমূল, সাতটি আসনই জয়ের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

জলপাইগুড়িতে ফের ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশল স্পষ্ট করে দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার জেলার নেতৃত্বের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি জানিয়ে দিলেন, এবার লক্ষ্য—জেলাজুড়ে ‘সাতে সাত’। অর্থাৎ, জেলার সাতটি বিধানসভা আসনের প্রতিটিতেই জয় চাইছে তৃণমূল।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে জলপাইগুড়ি আসন হাতছাড়া হয়েছিল শাসকদলের। তৃণমূল প্রার্থী নির্মল চন্দ্র রায়কে হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির ডঃ জয়ন্ত কুমার রায়। তার পর থেকেই জলপাইগুড়িতে বিজেপির সংগঠন মজবুত হতে থাকে। গত বছরেও ভোটের চিত্র একইরকম ছিল। রাজগঞ্জ, ডাবগ্রাম, মালবাজার বাদে বাকি চারটি বিধানসভা কেন্দ্রে পিছিয়ে ছিল তৃণমূল।

তথ্য বলছে, জলপাইগুড়ি জেলার চারটি পৌরসভায় প্রায় সর্বত্রই এগিয়ে ছিল বিজেপি। জলপাইগুড়ি পৌরসভার ২৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৪টিতেই এগিয়ে ছিল গেরুয়া শিবির। ময়নাগুড়ি পৌরসভার ১৭টির মধ্যে ১৬টি, ধূপগুড়ির ১৬টির সবকটিতেই এবং মালবাজার পৌরসভার ১৫টির সবটিতেই বিজেপির আধিপত্য ছিল স্পষ্ট।

এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে জলপাইগুড়ি সফরে এসে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত ঘুরে দাঁড়ানোর যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। সাতটি বিধানসভা আসনে জয় হাসিল করাই এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। তৃণমূলের দাবি, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটেও জলপাইগুড়ির বেশ কয়েকটি আসন বিজেপির হাতে ছিল। রাজগঞ্জ, জলপাইগুড়ি ও মালবাজারে তৃণমূল জিতলেও বাকি আসনগুলি দখলে রেখেছিল বিজেপি। পরবর্তীতে ধূপগুড়ি আসনে উপনির্বাচনে জয় পায় তৃণমূল।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর টার্গেট ঘোষণার পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক রদবদলের ইঙ্গিতও স্পষ্ট হয়েছে। ব্লক সভাপতিদের বদলের প্রস্তাব নিয়েই এই বৈঠকে আলোচনা করেন তিনি। জেলা নেতৃত্বের মতামত নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যা সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পাঠানো হবে। ব্লক স্তরের সংগঠন ঢেলে সাজিয়ে, শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ২০২৬-এর লড়াইয়ে নামতে চাইছে ঘাসফুল শিবির।

তৃণমূলের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানাচ্ছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জলপাইগুড়িতে দলের দুর্বলতা এবং বিজেপির শক্ত ঘাঁটি চিহ্নিত করে সেই জায়গাগুলিতে ফোকাস বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, বুথভিত্তিক সংগঠনকে আরও সক্রিয় করতে হবে। পুরসভা এবং পঞ্চায়েত স্তরে দলের অবস্থান আরও শক্ত করতে হবে। এই উদ্দেশ্যেই ব্লক নেতৃত্বে পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরি হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জলপাইগুড়িতে দলীয় সংগঠনের হাল ফেরাতে এবং ২০২৬-এর আগে একটি শক্ত বার্তা দিতে চায় তৃণমূল। সেই বার্তা একদম তৃণমূল স্তরের কর্মীদের কাছেও পৌঁছে দিতে চাইছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সাতটি বিধানসভা আসনের মধ্যে একটি আসনও যেন না যায় বিজেপির হাতে—এই বার্তা দিয়েই জেলাজুড়ে সংগঠনের মেরামতি শুরু করেছেন তিনি।

দলীয় নেতাদের উদ্দেশে অভিষেকের বার্তা ছিল একরকম স্পষ্ট—লোকসভা ভোটে দুর্বলতা ছিল, স্বীকার করছি। কিন্তু সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন থেকেই ঝাঁপাতে হবে। কর্মীদের চাঙা করতে হবে, মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে, এবং দলীয় ভাবমূর্তি আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।

তৃণমূল সূত্রে আরও জানা গেছে, আগামী দিনে জলপাইগুড়ি জেলার প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রেই আলাদা করে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হবে। যাঁরা নিয়মিত মাটির কাছাকাছি থেকে রিপোর্ট পাঠাবেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে। অভিষেক নিজে সেই রিপোর্ট মনিটর করবেন বলে জানা গেছে।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই বৈঠকে আরও একবার বুঝিয়ে দিলেন, তিনি শুধু বক্তৃতা দিয়ে থেমে থাকেন না, বাস্তব কাজেও নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত। এখন দেখার, জলপাইগুড়িতে তাঁর এই ‘সাতে সাত’ টার্গেট আগামী নির্বাচনে কতটা বাস্তবে রূপ নেয়।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

বিজ্ঞাপন

আরও খবর