সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামের রিয়া সর্দার ও রাখী নস্করকে তাঁদের সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য শুভেচ্ছা জানালেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার কুলতলিতে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় ফোনে দুই নববিবাহিতাকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, “সুন্দরবনের মাটি থেকে এক অনন্য ইতিহাস রচিত হয়েছে। রিয়া ও রাখী দেখিয়ে দিয়েছে, ভালবাসা কোনও বাধা মানে না— না ধর্মের, না লিঙ্গের, না সমাজের।”
দক্ষিণ ২৪ পরগনার মন্দিরবাজার থানার বাসিন্দা রিয়া এবং কুলতলি ব্লকের বকুলতলার রাখী সম্প্রতি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। সমাজের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে উপেক্ষা করে তাঁদের এই সাহসী পদক্ষেপের প্রশংসা করছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলও।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ফোনে বলেন, “আমাদের সমাজের প্রচলিত ছকের বাইরে গিয়ে তারা ভালবাসার সত্যিকারের অর্থকে তুলে ধরেছে। তাঁদের সাহস, শ্রদ্ধা, এবং একে অপরের প্রতি নিষ্ঠা আগামী প্রজন্মের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে।”
অভিষেকের এই মন্তব্য শুধু একটি শুভেচ্ছা নয়, রাজনৈতিক অর্থেও তা তাৎপর্যপূর্ণ। সমলিঙ্গ বিবাহ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে এমন স্পষ্ট অবস্থান এই প্রথম। বিজেপি-ঘেঁষা রাজনৈতিক দলগুলি যেখানে এখনো এই বিষয়ে রক্ষণশীল মনোভাব রাখে, সেখানে তৃণমূলের এই অবস্থান রাজ্যের সামাজিক পরিসরে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
অভিষেক আরও বলেন, “রিয়া-রাখী দেখিয়েছে, ভালবাসা মানেই মানবতা। সমাজকে এটাই শেখা উচিত— মানবতাই সমাজের আসল পরিচয়।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে তৃণমূল একদিকে যেমন সামাজিক উদারতার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে বিজেপির রক্ষণশীল নীতির বিরুদ্ধেও কৌশলগত অবস্থান নিচ্ছে। উত্তর ভারতের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে যেখানে ভিন্ন ধর্ম বা জাতির বিবাহে বাধা দেওয়া হয়, সেখানে বাংলায় তৃণমূলের এই অবস্থান ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি’র দিকেই ইঙ্গিত করছে।
সোমবার কুলতলিতে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বিধায়ক গণেশচন্দ্র মণ্ডল ও সাংসদ বাপি হালদার। সভায় অভিষেক ফোনে প্রতিশ্রুতি দেন, শীঘ্রই তিনি কুলতলিতে যাবেন এবং গ্রামবাসীদের সঙ্গে দেখা করবেন। বলেন, “ওই গ্রামের উন্নয়নের জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তা রাজ্য সরকার করবে।”
এই আঞ্চলিক কর্মসূচিতে অভিষেকের সরাসরি অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, তৃণমূল শুধু রাজনৈতিক দলে সীমাবদ্ধ নয়— সমাজের পরিবর্তনের দিকেও সমানভাবে মনোযোগী। তাঁর শুভেচ্ছাবার্তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। অনেকে একে বাংলার রাজনীতিতে এক ‘উদার ও প্রগতিশীল’ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
অভিষেকের বক্তব্যের শেষ অংশে ছিল এক গভীর মানবিক বার্তা। তিনি বলেন, “রিয়া ও রাখী জানত, এই সিদ্ধান্ত সহজ হবে না। কটাক্ষ, বাধা, প্রতিকূলতা আসবে। কিন্তু তারা পিছিয়ে যায়নি— একসঙ্গে থাকার লড়াই জারি রেখেছে। আমি তাঁদের কুর্নিশ জানাই।”
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস শুধু সমলিঙ্গ বিবাহ নয়, বরং প্রতিটি মানুষের নিজের মতো করে বাঁচার অধিকারের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিল। সমাজের প্রতি এক নতুন মনোভাব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটল সুন্দরবনের মাটি থেকে।



