কলকাতা: আধার কার্ড কি ভারতের নাগরিকত্বের প্রমাণ হতে পারে? এই প্রশ্নের জবাব এদিন স্পষ্ট করে দিল নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)। সোমবার দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (Jagnesh Kumar) ঘোষণা করলেন, আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, এটি শুধুমাত্র পরিচয়পত্র।
জ্ঞানেশ কুমার বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) জানিয়ে দিয়েছে, আধার আইন (Aadhaar Act) অনুযায়ী আধার কার্ড ব্যবহার করতে হবে। সেই আইনের নবম ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, আধার নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, এটি পরিচয় প্রমাণের নথি।” তিনি আরও যোগ করেন, “আধার জন্ম তারিখের প্রমাণও নয়। এখনো যদি আপনি একটি নতুন আধার ডাউনলোড করেন, সেখানে লেখা থাকে— এটি জন্ম তারিখ বা নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়।”


(অবশ্যই পড়ুন: নাগরিকত্ব নয়, তাহলে আধার কার্ড বাধ্যতামূলক কেন? পরোক্ষ তোলাবাজি ও তথ্যের ব্যবসা কার স্বার্থে?)
আধার থাকলেই কেন নাগরিক নন? ভারতে বহু মানুষ আধার কার্ডকেই নাগরিকত্বের প্রতীক বলে ধরে নেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যে পরিষ্কার, আধার মূলত পরিচয় যাচাই (Identity Verification)-এর জন্য ব্যবহৃত হয়, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য নয়। কারণ, আধার কার্ড UIDAI (Unique Identification Authority of India)-এর মাধ্যমে দেওয়া হয়, যা শুধুমাত্র বাসিন্দাদের জন্য প্রযোজ্য, নাগরিকদের জন্য নয়।
অর্থাৎ, কেউ ভারতে দীর্ঘদিন বসবাস করলেও তিনি যদি নাগরিক না হন, তাহলেও আধার পেতে পারেন। সেই কারণেই এটি নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়।


এসআইআর প্রক্রিয়া ও আধার বিতর্ক: নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে বাংলা-সহ ১২ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (SIR – Special Intensive Revision) শুরু হচ্ছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন। এর মধ্যেই আধার নিয়ে কমিশনের এই মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, ভোটার তালিকায় নাম তুলতে বা যাচাইয়ের সময় অনেক ক্ষেত্রেই আধার নম্বর চাওয়া হয়। কিন্তু কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, আধার দিলেই নাগরিকত্ব প্রমাণ হয় না, বরং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য জন্ম শংসাপত্র, পাসপোর্ট, বা অন্যান্য সরকারি নথির প্রয়োজন।
প্রশ্ন উঠছে, তবে ভোটার কার্ডের গুরুত্ব কী? সাধারণ মানুষের একাংশের প্রশ্ন— যদি আধার কার্ড ও ভোটার কার্ড কোনওটিই নাগরিকত্বের প্রমাণ না হয়, তবে কোন নথি দিয়ে একজন ভারতীয় নাগরিক নিজের পরিচয় প্রমাণ করবেন?
এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ভোটার কার্ড একজন নাগরিকের ভোটাধিকার প্রমাণ করে, কিন্তু নাগরিকত্ব নয়। একইভাবে, রেশন কার্ড বা আধার কার্ড নাগরিক সনাক্তকরণে সহায়ক হলেও, তা নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
তবে বাস্তবে আধারই এখন রেশন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, এমনকি ভোটার কার্ড সংযুক্তির জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে। ফলে নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে— আধার যদি প্রাথমিক নাগরিক পরিচয় না হয়, তবে এর সংযুক্তিকরণের প্রয়োজনীয়তা কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভ্রান্তি দূর করার দায়িত্ব সরকারের: প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের দাবি, নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আইন ও আধার ব্যবহারের উদ্দেশ্য নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন। আধার আইনের ধারা ৯ অনুযায়ী, এটি নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়— তবুও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে এটি ‘অবশ্যপূরণীয়’ নথি হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিরোধিতা দূর না হলে সাধারণ মানুষ আরও বিভ্রান্ত হবেন, বিশেষত ভোটার তালিকা সংশোধন বা SIR-এর মতো প্রক্রিয়ায়।
আধার কার্ড এখন প্রায় প্রতিটি নাগরিকের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যে পরিষ্কার, আধার থাকা মানেই নাগরিকত্ব নয়। নাগরিক পরিচয়ের জন্য প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজন অন্যান্য সরকারি নথি, যেমন জন্ম শংসাপত্র বা পাসপোর্ট। নাগরিকত্ব প্রমাণে আধার নয়, প্রমাণ চাই নথির।









