মালদহে একের পর এক স্থানীয় প্রশাসনিক বোর্ডে বদলাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ। জেলা পরিষদের পর এ বার ইংরেজবাজার পুরসভাতেও বোর্ড গঠন করল বিজেপি। বুধবার চেয়ারম্যান নির্বাচনের ভোটাভুটিতে বিজেপির অম্লান ভাদুড়িকে সমর্থন করলেন তৃণমূলের ১১ জন ‘নির্দল’ কাউন্সিলর। সঙ্গে ছিলেন আরও এক নির্দল কাউন্সিলর। ফলে নিজেদের তিন কাউন্সিলর নিয়েই পুরসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্কে পৌঁছে গেল বিজেপি।
ইংরেজবাজার পুরসভার চেয়ারম্যান পদটি এত দিন ছিল তৃণমূলের দখলে। প্রাক্তন চেয়ারম্যান কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী পদত্যাগ করার পর নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচনকে ঘিরেই শুরু হয় টানাপড়েন। বুধবার বোর্ড গঠনের সভায় বিজেপির অম্লান ভাদুড়ির নাম চেয়ারম্যান পদে প্রস্তাব করা হয়। বিজেপির কাউন্সিলর সুতপা মুখোপাধ্যায় প্রস্তাবটি রাখেন, সমর্থন করেন কৃষ্ণা নাগ।
এর পরেই ভোটাভুটিতে অম্লানকে সমর্থন করেন তৃণমূল থেকে নিজেদের ‘নির্দল’ ঘোষণা করা ১১ কাউন্সিলর। আরও এক নির্দল কাউন্সিলরের সমর্থন মেলায় বিজেপির পক্ষে মোট ১৫টি ভোট পড়ে বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে। ফলে মাত্র তিনজন বিজেপি কাউন্সিলর থাকা সত্ত্বেও পুরবোর্ডের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যায়।
চেয়ারম্যান নির্বাচনের ঠিক আগে ১১ জন তৃণমূল কাউন্সিলর নিজেদের নির্দল হিসেবে ঘোষণা করেন। এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে লিখিত ভাবেও জানানো হয়। তাঁদের বক্তব্য, দলত্যাগ নয়, বরং নিজেদের ‘নির্দল’ পরিচয়ে পুরসভার বাকি সময় কাজ করতে চান তাঁরা।
ওই শিবিরের কাউন্সিলর শুভময় বসুর বক্তব্য, তৃণমূলের প্রতীক নিয়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরে তাঁরা নিজেদের পরিচয় নিয়ে সমস্যায় পড়েছিলেন। একই সঙ্গে পুর পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগও তোলেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, সাধারণ মানুষ তাঁদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছিলেন পরিষেবা দেওয়ার জন্য, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সেই কাজ ঠিকমতো করা যাচ্ছিল না।
এই কাউন্সিলররা চেয়ারম্যান পদে নিজেদের কোনও প্রার্থী দিচ্ছেন না বলেও আগে জানিয়েছিলেন। ফলে ভোটাভুটির সময় তাঁদের সমর্থন কোন দিকে যায়, সেটিই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত সেই সমর্থন যায় বিজেপির প্রার্থী অম্লান ভাদুড়ির দিকে।
১১ কাউন্সিলরের সমর্থনকে তৃণমূল ভাঙানোর ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ নতুন চেয়ারম্যান অম্লান ভাদুড়ি। তাঁর বক্তব্য, চেয়ারম্যান পদত্যাগ করার পর নিয়ম মেনেই নতুন বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া হয়েছে। তাঁর নাম চেয়ারম্যান পদে প্রস্তাব করা হয়েছিল এবং ওই কাউন্সিলররা তাঁকে সমর্থন করেছেন।
অর্থাৎ বিজেপির তরফে কাউন্সিলর ভাঙিয়ে বোর্ড দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অম্লান। অন্য দিকে, তৃণমূলের ১১ কাউন্সিলর নিজেদের নির্দল ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এটাই এই মুহূর্তে ইংরেজবাজার পুরসভার নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মূল বিষয়।
ইংরেজবাজার পুরসভায় এত দিন তৃণমূলেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। মোট ২৯টি আসনের পুরসভায় তৃণমূলের দখলে ছিল ২৫টি আসন। বুধবার চেয়ারম্যান নির্বাচনের সময় দলের বাকি কাউন্সিলররাও সভায় উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ১১ জন কাউন্সিলর নির্দল অবস্থান নেওয়ার পর ভোটের অঙ্ক সম্পূর্ণ বদলে যায়।
প্রাক্তন চেয়ারম্যান কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরীও সভায় উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক তথা প্রাক্তন চেয়ারম্যান নীহাররঞ্জন ঘোষের স্ত্রী গায়ত্রী ঘোষও। অতীতে কৃষ্ণেন্দু ও নীহাররঞ্জনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব একাধিক বার প্রকাশ্যে এলেও এ দিনের সভায় দু’পক্ষের প্রতিনিধিদের একই জায়গায় দেখা যায়।
ভোটাভুটির পর কৃষ্ণেন্দুর বক্তব্য, নিয়ম অনুযায়ী যা হওয়ার সেটাই হয়েছে। ১১ কাউন্সিলর কেন নির্দল হলেন, সে বিষয়ে তিনি বলেন, সেটি তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
ইংরেজবাজার পুরসভার এই পালাবদলের ঠিক আগের দিনই মালদহ জেলা পরিষদে বোর্ড গঠন করে বিজেপি। সেখানেও বিজেপির হাতে ছিল মাত্র চার জন নির্বাচিত সদস্য। তৃণমূলের একাংশের সমর্থনে বিজেপির দীপালি বালা সভাধিপতি নির্বাচিত হন। মোট ৪৩ সদস্যের জেলা পরিষদে কংগ্রেস ভোটাভুটি বয়কট করেছিল বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে।
ফলে পরপর দু’দিনে মালদহের জেলা পরিষদ এবং ইংরেজবাজার পুরসভায় রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেল। দু’ক্ষেত্রেই বিজেপির হাতে মূল সংখ্যার তুলনায় কম নির্বাচিত সদস্য থাকা সত্ত্বেও তৃণমূলের একাংশের সমর্থন তাদের বোর্ড গঠনের রাস্তা খুলে দিয়েছে।
ইংরেজবাজার পুরসভায় নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন অম্লান ভাদুড়ি। এখন তাঁর সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে পুর পরিষেবা স্বাভাবিক রাখা এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যেই পুরসভার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আর তৃণমূলের ১১ কাউন্সিলরের নির্দল অবস্থান ভবিষ্যতে কী রাজনৈতিক রূপ নেয়, সেদিকেও নজর থাকবে মালদহের রাজনীতিতে।



