ফ্লাইদুবাইয়ের তেল আভিভগামী বিমানে সহ-পাইলটের হামলার তদন্তে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, ওমানের নাগরিক সহ-পাইলট হামাম আল-হাম্মামি নাকি গাজ়ায় ইজ়রায়েলের সামরিক অভিযানের বদলা নিতে চেয়েছিলেন। তাঁর পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ইজ়রায়েলের বেন গুরিয়োঁ বিমানবন্দর। তবে এই উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনার কথা অভিযুক্ত নিজে তদন্তকারীদের জানিয়েছেন বলে দাবি করা হলেও, তদন্ত এখনও চলছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, ফ্লাইদুবাইয়ে চাকরি পাওয়ার আগেই হাম্মামি নাকি এই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। ইজ়রায়েলি আধিকারিকদের উদ্ধৃত করে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তেল আভিভগামী বিমান চালায় এমন সংস্থাগুলির খোঁজ করেছিলেন তিনি। পরে সেই বিমান সংস্থাগুলির মধ্যে ফ্লাইদুবাইকেই বেছে নিয়ে চাকরির আবেদন করেন বলে তদন্তকারীদের দাবি।
ইজ়রায়েলের তদন্তকারী আধিকারিকদের উদ্ধৃত করে প্রকাশিত তথ্যে আরও দাবি করা হয়েছে, হাম্মামি জেরায় জানিয়েছিলেন, গাজ়ায় ইজ়রায়েলের হামলার প্রতিশোধ নেওয়াই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নিজের জীবন দিতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন বলে তদন্তকারীদের কাছে জানিয়েছেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। তবে এই বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি এবং হাম্মামি বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির হেফাজতে রয়েছেন।
তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী, তাঁর পরিকল্পনা শুধু গত ৩০ সেপ্টেম্বরের ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এ বছরের গোড়ায় তেল আভিভগামী আরও একটি বিমান পরিচালনা করেছিলেন হাম্মামি। সেই সময়ও বিমানটি ছিনতাই করে ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তবে কোনও এক পরিচিত ব্যক্তি ওই বিমানে থাকায় শেষ পর্যন্ত তিনি পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন বলে তদন্ত-সূত্রের দাবি।
গত ৩০ সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি ঘটে দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে। মাঝ আকাশে হাম্মামি ককপিটে থাকা জরুরি ফায়ার অ্যাক্স দিয়ে ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরকে আক্রমণ করেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। গুরুতর আহত অবস্থাতেও ক্যাপ্টেন ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। পরে কেবিন ক্রু এবং কয়েক জন যাত্রী মিলে হাম্মামিকে নিয়ন্ত্রণে আনেন।
এর পর বিমানের নিয়ন্ত্রণ সামলে জরুরি অবতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে বিমানটি নিরাপদে নামানো হয়। ঘটনায় হাম্মামিকে হেফাজতে নেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ; পরবর্তী তদন্তে তাঁকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির কৌঁসুলির দফতর ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসবাদী হামলার চেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ঘটনার পর থেকেই হাম্মামির অতীত নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, তিনি আগে নিউজ়িল্যান্ডে বিমান প্রশিক্ষণের একটি অংশ নিয়েছিলেন এবং ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের মে পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। তাঁর অতীতের গতিবিধি এবং বিভিন্ন দেশে যাতায়াতও তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে।
ইজ়রায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, হাম্মামি একাই এই পরিকল্পনা করেছিলেন, নাকি তাঁর পিছনে কোনও সংগঠন বা তৃতীয় পক্ষ ছিল। আপাতত ইজ়রায়েলি তদন্তকারীদের মূল্যায়নে সংগঠিত কোনও গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর যোগসূত্রের নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি। একই সঙ্গে তাঁর বিদেশ সফর, পূর্ববর্তী কাজ এবং ফ্লাইদুবাইয়ে নিয়োগের প্রক্রিয়াও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনায় বিমান সংস্থার নিরাপত্তা যাচাই এবং পাইলট নিয়োগের প্রক্রিয়াও প্রশ্নের মুখে। কারণ, তদন্তকারীদের দাবি সত্যি হলে, হাম্মামি ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার আগেই তেল আভিভগামী বিমানকে হামলার জন্য বেছে নিয়েছিলেন। ফলে কী ভাবে তাঁর অতীতের তথ্য যাচাই করে তাঁকে ইজ়রায়েলগামী উড়ানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়েও তদন্ত চলছে।
এখনও তদন্ত শেষ হয়নি। হাম্মামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ্যে আসেনি এবং তাঁর কথিত উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা সম্পর্কে যে তথ্য সামনে এসেছে, তার বড় অংশই তদন্তকারী সূত্র ও ইজ়রায়েলি আধিকারিকদের বক্তব্যনির্ভর। ফলে ‘গাজ়ার বদলা’কে তাঁর নিশ্চিত উদ্দেশ্য হিসেবে নয়, তদন্তে উঠে আসা কথিত মোটিভ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।



