অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বই থেকে মুছে গেল সিঙ্গুর আন্দোলন থেকে কন্যাশ্রী, পরিবর্তনের জমানায় বাদ পানি, আব্বা, আম্মুর মত শব্দ

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের আগে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলপাঠ্যে সংশোধন আনা হচ্ছে। অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস থেকে সিঙ্গুর আন্দোলন ও কন্যাশ্রী বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পশ্চিমবঙ্গের স্কুলের পাঠ্যবইয়ে ফের একাধিক পরিবর্তন আসতে চলেছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য তৈরি হতে চলা সংশোধিত বইয়ে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস থেকে ‘সিঙ্গুর আন্দোলন’ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সিলেবাস-কারিকুলাম কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন। একইসঙ্গে পাঠ্যসূচিতে থাকা কন্যাশ্রী প্রকল্প নিয়েও পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

অন্যদিকে, দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও অবদান অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে আগামী শিক্ষাবর্ষে রাজ্যের স্কুলপাঠ্যে ইতিহাস ও সমকালীন বিষয়গুলির উপস্থাপনায় বেশ কিছু বদল দেখা যেতে পারে।

অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের বইয়ে সিঙ্গুর আন্দোলনের একটি অধ্যায় বা অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০০৬ সালে সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে ওঠে। তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সেই আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে রাজ্য রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠেছিল।

২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াকে বেআইনি ঘোষণা করে এবং জমি ফেরতের নির্দেশ দেয়। পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে পাঠ্যবইয়ে জায়গা দেওয়া হয়েছিল। ২০১৬-১৭ বা ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের সময় অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের বইয়ে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয় বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।

এবার সেই অংশই বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেবাস-কারিকুলাম কমিটির চেয়ারম্যান। অধ্যাপক দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, কমিটি বিষয়টিকে ‘পরিমার্জন’ বা ‘সংশোধন’ হিসেবে দেখছে এবং ২০০৬ সালের সিঙ্গুর আন্দোলনকে নতুন বইয়ে না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শুধু সিঙ্গুর নয়, পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম পরিচিত সরকারি প্রকল্প কন্যাশ্রীও নতুন পাঠ্যবইয়ে থাকছে না বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে। কন্যাশ্রী প্রকল্পটি কিশোরীদের শিক্ষায় ধরে রাখা এবং বাল্যবিবাহ রোধের লক্ষ্যে চালু করা হয়েছিল।

সিলেবাস কমিটির চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, কন্যাশ্রী প্রকল্পের আলোচনায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট চিন্তাধারাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছিল। সেই অংশটিও সরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছে।

তবে কন্যাশ্রী প্রকল্পের সরকারি কার্যক্রম বন্ধ করা হচ্ছে—এমন কোনও তথ্য এই পাঠ্যসূচি সংশোধনের প্রতিবেদনে নেই। বিষয়টি শুধুমাত্র স্কুলের পাঠ্যবইয়ে কী থাকবে, আর কী থাকবে না—সেই সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ইতিহাসের বিষয়বস্তুর পাশাপাশি ভাষার ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তনের কথা সামনে এসেছে। ‘পানি’, ‘আব্বা’, ‘আম্মু’-র মতো শব্দ নতুন বইয়ে রাখা হবে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সংশোধনের পর শুধু অধ্যায় বা ঐতিহাসিক ঘটনার ক্ষেত্রেই নয়, পাঠ্যবইয়ের শব্দচয়নেও কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

তবে কোন শব্দের পরিবর্তে ঠিক কোন শব্দ ব্যবহার করা হবে, তার পূর্ণ তালিকা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে এই পরিবর্তন কতটা বিস্তৃত হবে, তা নতুন বই প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।

নতুন সংশোধনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও অবদান পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত। রিপোর্ট অনুযায়ী, দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন বইয়ে তাঁর জীবনী বা অবদানের বিষয়টি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের নতুন সিলেবাস-কারিকুলাম কমিটি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর সঙ্গে রাজ্যের পাঠ্যক্রমের সামঞ্জস্য তৈরির লক্ষ্যেও কাজ করছে। জুলাইয়ে গঠিত এই কমিটিকে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যক্রম, সিলেবাস ও পাঠ্যবই পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

ইতিহাস বইয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের অংশ নিয়েও পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন কমিটির চেয়ারম্যান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজন অনুযায়ী মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস রাখা হবে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের ইতিহাসকে শুধু মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস হিসেবে দেখা উচিত নয়।

এই বক্তব্যের অর্থ কীভাবে নতুন বইয়ের অধ্যায় বিন্যাসে প্রতিফলিত হবে, তা চূড়ান্ত পাঠ্যবই প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।

জানুয়ারির শুরুতেই নতুন বই

রাজ্যের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই ২ জানুয়ারি থেকেই পড়ুয়াদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। সেই কারণেই এখন সংশোধিত বই তৈরির কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। স্কুল শিক্ষা দফতরের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল, ২০২৭ সালে পুরনো পাঠ্যবইয়ের উপর সীমিত সংশোধন থাকবে এবং পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যক্রম সংস্কার ২০২৮ শিক্ষাবর্ষে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ফলে আসন্ন পরিবর্তনকে সম্পূর্ণ নতুন সিলেবাসের বদলে পাঠ্যবইয়ের সংশোধিত সংস্করণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন বই প্রকাশের পরই কোন কোন অধ্যায়, তথ্য ও শব্দ শেষ পর্যন্ত রাখা বা বাদ দেওয়া হয়েছে, তার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন