রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের থেকেও বড় হিন্দু এই ‘পাখণ্ডী’ বাবা! বাঙালি কি রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষা দিচ্ছে?

রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের থেকেও বড় হিন্দু এই ‘পাখণ্ডী’ বাবা? বাঙালি কি রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষা দিচ্ছে?

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অর্ক সানা: বাঙালিকে তাঁর পাতে কী থাকবে, সেটাও কি এবার বাইরে থেকে শেখানো হবে? দুর্গাপুজোয় মাছ-মাংস রান্না বা খাওয়া নাকি ‘পাষণ্ডতা’, আমিষ খেলেই নাকি মানুষ ‘পাখণ্ডী’! পশ্চিমবঙ্গে এসে এমনই বার্তা দিয়েছেন বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী। তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, কংগ্রেস পুলিশে অভিযোগ করেছে, আর বিপাকে পড়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও প্রকাশ্যে বলেছেন—বাঙালি কী খাবেন, তা কোনও সাধু-সন্ত ঠিক করে দিতে পারেন না।

কিন্তু প্রশ্নটা আরও বড়। কারণ এই বক্তব্য যে সময়ে, যে রাজ্যে, যে রাজনৈতিক আবহে দেওয়া হচ্ছে, তার ঠিক আগে-পরে ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীকে ঘিরে রাজ্য সরকারের আতিথেয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা কলকাতার একটি সরকারি গেস্ট হাউসে তাঁকে নৈশভোজে আপ্যায়ন করেছেন।

তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—যে অতিথি বাংলার মানুষের খাদ্যাভ্যাসকে ‘পাষণ্ডতা’ বলে দাগিয়ে দিচ্ছেন, তাঁর প্রতি সরকারের আতিথেয়তা কি শুধুই সৌজন্য? আর যদি সৌজন্যই হয়, তাহলে বাঙালির অপমানের বিরুদ্ধে সরকারের নিজের অবস্থানটা কোথায়?

কারণ বিষয়টি নিছক মাছ-মাংসের নয়। বিষয়টি বাঙালির ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং নিজের মতো করে হিন্দু হয়ে থাকার অধিকার নিয়ে। আর এই জায়গাতেই ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর বক্তব্যের সামনে দাঁড় করানো দরকার বাংলারই দুই শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় মনীষী—শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস এবং স্বামী বিবেকানন্দকে।

রামকৃষ্ণদেবের কাছে ধর্মের মাপকাঠি কী ছিল? নরেন্দ্রনাথ একদিন হোটেলে খেয়ে এসে গুরুদেবকে জানান যে তিনি এমন খাবার খেয়েছেন, যা সমাজে ‘নিষিদ্ধ’ বলে বিবেচিত। রামকৃষ্ণদেবের উত্তর ছিল চমকে দেওয়ার মতো। তিনি বলেন, কেউ যদি pork বা beef খেলেও তাঁর মন ঈশ্বরে স্থির থাকে, তবে সেই খাদ্যও পবিত্র আহারের মতো; আর কেউ যদি শাকসবজি খেলেও তার মন জাগতিক কামনায় ডুবে থাকে, তাহলে সেই নিরামিষও কোনও অর্থে উন্নততর নয়।

অর্থাৎ রামকৃষ্ণের কাছে থালার চেয়ে বড় ছিল মন।

এই কথাটি আজকের দিনে কতটা অস্বস্তিকর, সেটা বোঝা কঠিন নয়।

কারণ আজ যদি একজন ধর্মগুরু এসে বলেন, দুর্গাপুজোয় মাছ-মাংস খেলে আপনি ‘পাখণ্ডী’, তাহলে রামকৃষ্ণের সামনে সেই প্রশ্নটি দাঁড় করাতেই হয়—আপনি কি তাঁর চেয়েও বড় করে ধর্মের সার্টিফিকেট বিলি করতে শুরু করেছেন?

আর শুধু রামকৃষ্ণ কেন? তাঁরই নরেন, যিনি পরে স্বামী বিবেকানন্দ নামে বিশ্বজুড়ে হিন্দুধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাতা হয়ে উঠলেন, খাদ্য নিয়ে আরও সরাসরি কথা বলেছেন।

The Complete Works of Swami Vivekananda-এর পঞ্চম খণ্ডে শিষ্যের প্রশ্ন ছিল—মাছ-মাংস খাওয়া কি প্রয়োজন বা উচিত? বিবেকানন্দের উত্তর: “Ay, take them, my boy!” অর্থাৎ—“হ্যাঁ, খাও।”

তারপর তিনি দেশের মানুষের দুর্বলতা, কর্মশক্তির অভাব এবং জড়তার কথা বলেছিলেন। এমনকি রজোগুণ প্রয়োজন বলেও তিনি মাছ-মাংস খাওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে।

এখানে অবশ্য বিবেকানন্দকে টুকরো করে উদ্ধৃত করলেই চলবে না। তিনি কখনও বলেননি যে আমিষ খেলেই মানুষ আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত। বরং তাঁর যুক্তি ছিল আরও গভীর—মানুষের চরিত্রে সত্যিকারের সত্ত্বগুণ বিকশিত হলে ভোগের আকাঙ্ক্ষা নিজে থেকেই কমে যায়। তাঁর কাছে আত্মত্যাগ, অহংকারহীনতা, অনাসক্তি—এসব ছিল সত্ত্বের লক্ষণ।

অর্থাৎ, খাবার দিয়ে ধর্মের সার্টিফিকেট দেওয়া নয়; মানুষের চরিত্র দিয়ে তার আধ্যাত্মিকতার বিচার।

আর বিবেকানন্দের আরও একটি বক্তব্য আজকের বিতর্কে যেন সরাসরি এসে পড়ে। খাদ্য ও জাতপাতের গোঁড়ামি নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি তীব্র ব্যঙ্গ করেছিলেন— “Your religion seems nowadays to be confined to the cooking-pot alone.” অর্থাৎ, “তোমাদের ধর্ম যেন আজকাল রান্নার হাঁড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।”

এই একটি বাক্যই কি আজকের বিতর্কের আয়না নয়? আজও কি আমরা ধর্মকে রান্নার হাঁড়িতে আটকে দিতে চাইছি?

কে মাছ খাবে, কে মাংস খাবে, দুর্গাপুজোয় কী রান্না হবে, কোন খাবার ‘শুদ্ধ’, কোনটি ‘অশুদ্ধ’—এই প্রশ্নগুলিকে যদি ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের বিস্তৃত হিন্দুধর্ম কোথায় থাকে?

বরং তখন ধর্ম দাঁড়িয়ে যায় খাদ্য পুলিশের সামনে। এবং এই জায়গাটিই রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ একজন ব্যক্তি নিরামিষ খাবেন—এটি তাঁর অধিকার। একজন ব্যক্তি মাছ-মাংস খাবেন—এটিও তাঁর অধিকার। কেউ উপবাস করবেন, কেউ ভোগ রান্না করবেন, কেউ আমিষ খাবেন—ভারতের সংবিধানসম্মত নাগরিক জীবনে ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাসের জায়গাটি এতটাই মৌলিক যে কোনও ধর্মগুরুর ব্যক্তিগত পছন্দকে গোটা সমাজের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক অভিযোগ উঠেছে। কংগ্রেস ভবানীপুর থানায় অভিযোগ করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, তাঁর মন্তব্য বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি ও ধর্মীয় আবেগকে আঘাত করেছে।

কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল সরকারের অবস্থান। একদিকে একজন অতিথিকে সরকারি আতিথেয়তা দেওয়া হচ্ছে—অন্যদিকে সেই অতিথির বক্তব্যে বাংলার মানুষকে ‘পাষণ্ড’ বা ‘পাখণ্ডী’ বলা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। তারপরও সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রতিবাদ নেই কেন?

সরকার কি মনে করে বাঙালির অপমানের প্রতিবাদ করার চেয়ে একজন প্রভাবশালী ধর্মগুরুকে সন্তুষ্ট রাখা বেশি রাজনৈতিকভাবে লাভজনক? প্রশ্নটি আরও কঠিন।

যদি কোনও ধর্মগুরু এসে বাংলার মানুষকে বলেন, দুর্গাপুজোয় মাছ-মাংস খাবেন না—তাহলে তিনি আসলে কাকে নির্দেশ দিচ্ছেন? নিজের ভক্তদের? নাকি গোটা বাংলাকে?

নিজের ভক্তদের কোনও নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাসের পরামর্শ দেওয়া তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মীয় অধিকার। কিন্তু বাংলার মানুষকে তাঁর খাদ্যাভ্যাসের মাপকাঠিতে বিচার করা শুরু হলে প্রশ্ন উঠবে—বাংলার হিন্দুত্বের সংজ্ঞা কি এখন বাগেশ্বর ধাম থেকে নির্ধারিত হবে?

বাংলার হিন্দু কি তাঁর ধর্মচর্চা শিখবেন রামকৃষ্ণের কাছ থেকে, নাকি অন্য রাজ্য থেকে আসা কোনও বাবার কাছ থেকে?

বাংলার দুর্গাপুজো কি বাংলার শতাব্দীপ্রাচীন শাক্ত, লোকায়ত ও সামাজিক সংস্কৃতির ভিতর থেকে তার নিজস্ব রূপে থাকবে, নাকি তাকে উত্তর ভারতের কোনও একমাত্রিক খাদ্য-ধর্মের ছাঁচে ঢেলে দেওয়া হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত জরুরি। কারণ বাঙালির ধর্মীয় সংস্কৃতি কখনও এত সরলরৈখিক ছিল না।

দুর্গাপুজো মানেই সারা বাংলায় একই রকম আচার নয়। কোথাও নিরামিষ ভোগ, কোথাও মাছের ভোগ, কোথাও বলির ঐতিহ্য—বাঙালির শাক্ত সংস্কৃতির ভিতরে বহুত্ব বরাবরই ছিল। বিজেপির প্রবীণ নেতা দিলীপ ঘোষও এই বিতর্কে বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেছেন এবং বহু মন্দিরে বলি ও দেবীকে মাছ নিবেদনের প্রথার কথা বলেছেন।

তাহলে হঠাৎ করে কে এসে বলবেন—“এটা পাপ, ওটা পাষণ্ডতা, আমিষ খেলেই তুমি ধর্মভ্রষ্ট”?

এবং আরও বড় প্রশ্ন—সরকার কি সেই কথার প্রতিবাদ করবে, নাকি রাজনৈতিক অঙ্কের খাতায় তাকে ‘সাধুবাবা’ বলে ছাড় দিয়ে দেবে? এখানেই ‘রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষা’র প্রশ্নটি আসে।

আজ যদি বাঙালিকে বলা হয়, দুর্গাপুজোয় মাছ-মাংস খেলে তুমি ভালো হিন্দু নও, কাল হয়তো বলা হবে কোন গান শুনবে, কী পোশাক পরবে, কীভাবে পুজো করবে, কোন দেবতাকে কীভাবে মানবে। আজ পাতে হস্তক্ষেপ, কাল ব্যক্তিজীবনে, পরশু সাংস্কৃতিক পরিচয়ে।

এভাবেই খাদ্য-নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে পরিচয়-নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়।

আর যে বাঙালি রামকৃষ্ণের উদারতা, বিবেকানন্দের যুক্তিবাদ, চৈতন্যের ভক্তি, রামপ্রসাদের শাক্তি এবং লোকায়ত সংস্কৃতির বহুত্বকে একসঙ্গে ধারণ করেছে, তাকে যদি এখন একটিমাত্র খাদ্যাভ্যাস দিয়ে ‘আসল হিন্দু’ বা ‘ভণ্ড হিন্দু’ মাপতে হয়, তাহলে প্রশ্নটা বাঙালিরই করা উচিত—

আমরা কি নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্যও এখন বাইরে থেকে সার্টিফিকেট নেব?

রামকৃষ্ণদেব নরেনকে বলেছিলেন—ঈশ্বরে মন থাকলে তথাকথিত নিষিদ্ধ খাদ্যও মানুষকে কলুষিত করতে পারে না। বিবেকানন্দ বলেছিলেন, প্রয়োজনে মাছ-মাংস খাও; আর সতর্ক করেছিলেন, ধর্ম যেন রান্নার হাঁড়িতে বন্দি না হয়ে যায়।

তাহলে আজ প্রশ্ন উঠতেই পারে—রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের থেকেও বড় হিন্দু হয়ে গেলেন কে?
আর যদি না হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর কথায় বাঙালিকে ‘পাখণ্ডী’ বলার সাহসটা এল কোথা থেকে?

আর তার থেকেও বড় প্রশ্ন—বাঙালির পাতে কী থাকবে, সেটা কি এখন ধর্ম ঠিক করবে, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্য?

বাংলার মানুষকে শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নিতেই হবে—তাঁরা তাঁদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা নিজেরাই নির্ধারণ করবেন, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায় আসা কোনও ‘বাবা’ তাঁদের বলে দেবেন, দুর্গাপুজোয় বাঙালির পাতে কী উঠবে?

কারণ বিষয়টি শেষ পর্যন্ত মাছ-মাংসের নয়।
বিষয়টি বাঙালি নিজের মতো করে বাঙালি থাকবে কি না—সেই প্রশ্নের।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন