‘আগে ইস্তফা দিন’, এক মন্ত্রীকে বললেন অন্যজন! সংরক্ষণ ইস্যুতে তীব্র কোন্দল মোদি মন্ত্রিসভায়!

SC/ST সংরক্ষণে ‘ক্রিমি লেয়ার’ ও ‘কোটার মধ্যে কোটা’ নিয়ে মুখোমুখি NDA-র দুই শরিক। চিরাগ পাসওয়ান ও জিতন রাম মাঝির পাল্টাপাল্টি ইস্তফার দাবিতে বাড়ল রাজনৈতিক চাপ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: সংরক্ষণ নিয়ে এবার সরাসরি মুখোমুখি মোদি সরকারের দুই শরিক দলের দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। বিহারের দুই নেতা জিতন রাম মাঝি (Jitan Ram Manjhi) এবং চিরাগ পাসওয়ান (Chirag Paswan)-এর সংঘাত গড়াল ইস্তফার দাবিতে। SC/ST সংরক্ষণে ‘কোটার মধ্যে কোটা’ এবং ‘ক্রিমি লেয়ার’ নিয়ে মতবিরোধের জেরে প্রথমে মাঝির ইস্তফা দাবি করেন চিরাগ, পাল্টা চিরাগকেও পদ ছাড়ার চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন মাঝি।

সংরক্ষণ নীতির পুনর্বিবেচনা নিয়ে এই বিতর্কের সূত্রপাত হিন্দুস্তান আওয়াম মোর্চা (HAM)-এর অবস্থান থেকে। মাঝির দল দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, তফসিলি জাতি ও উপজাতির সংরক্ষণের মধ্যেও উপশ্রেণি তৈরি করে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়গুলিকে আলাদা সুবিধা দেওয়া দরকার।

মাঝি শিবিরের যুক্তি, বর্তমান ব্যবস্থায় সংরক্ষণের সুবিধা তুলনামূলকভাবে কয়েকটি জাতি ও পরিবারের মধ্যেই বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ফলে যে সম্প্রদায়গুলি সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে পিছিয়ে, তারা কাঙ্ক্ষিত সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকছে। তাঁদের দাবি, ‘কোটা-র মধ্যে কোটা’ করলে সংরক্ষণের সুবিধা আরও ন্যায্যভাবে বণ্টন করা সম্ভব হবে।

এই অবস্থানের ঘোর বিরোধিতা করেছেন চিরাগ পাসওয়ান। তাঁর দল লোক জনশক্তি পার্টি (রামবিলাস) (LJP-RV) SC/ST সংরক্ষণে উপশ্রেণিকরণ বা ‘ক্রিমি লেয়ার’ চালুর বিরোধী। চিরাগের বক্তব্য, দলিত সমাজকে আরও ভাগ করলে সামাজিক ন্যায়ের মূল উদ্দেশ্যই দুর্বল হবে। সংরক্ষণের ভিত্তি অর্থনৈতিক নয়, বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সুরক্ষা—এটাই তাঁর যুক্তি।

বিতর্ক চরমে ওঠে শনিবার। পাটনায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে চিরাগ সরাসরি বলেন, যদি জিতন রাম মাঝি SC/ST সংরক্ষণে ‘ক্রিমি লেয়ার’ চান, তাহলে তাঁকেই আগে সংরক্ষণের সুবিধা ছাড়তে হবে। শুধু মাঝি নন, তাঁর ছেলে এবং বিহার সরকারের মন্ত্রী সন্তোষ কুমার সুমনের (Santosh Kumar Suman) ইস্তফার দাবিও তোলেন তিনি।

চিরাগের বক্তব্য, সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক বিবৃতি না দিয়ে সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা হওয়া উচিত। সংবিধানে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হলে সেই আলোচনা সংসদের মেঝেতেই হওয়া দরকার বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

এরপরই পাল্টা আক্রমণে নামেন জিতন রাম মাঝি। তাঁর দাবি, চিরাগের অবস্থানের ফলে সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা অংশ সংরক্ষণের প্রকৃত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বৃহত্তর জনস্বার্থে সংরক্ষণের ভিতরে আরও দুর্বল শ্রেণির জন্য আলাদা ব্যবস্থা প্রয়োজন বলেই তিনি সওয়াল করেন।

চিরাগকে পাল্টা নিশানা করে মাঝি বলেন, যদি চিরাগ সত্যিই গরিব ও প্রয়োজনমতো সংরক্ষণের সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত না হন, তাহলে তাঁরও আগে নিজের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া উচিত। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ‘ইস্তফা দিন’ পাল্টাপাল্টি দাবিতে পৌঁছে যায় দুই শরিক দলের সংঘাত।

এই সংঘাতের রাজনৈতিক গুরুত্বও যথেষ্ট। কারণ জিতন রাম মাঝির HAM এবং চিরাগ পাসওয়ানের LJP-RV—দুই দলই জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (NDA)-এর শরিক। একইসঙ্গে বিহারের দলিত রাজনীতিতে দুই নেতারই নিজস্ব প্রভাব রয়েছে। ফলে সংরক্ষণ নিয়ে তাঁদের প্রকাশ্য বিরোধ শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক চাপানউতোর নয়, জোটের ভিতরে দলিত ভোটের প্রতিনিধিত্ব ও নীতিগত অবস্থান নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে। ২০২৪ সালের সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)-এর সাংবিধানিক বেঞ্চের রায়ে রাজ্যগুলিকে SC/ST সংরক্ষণের মধ্যে উপশ্রেণিকরণের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সেই রায়ের পর থেকেই ‘কোটার মধ্যে কোটা’ এবং SC/ST-এর মধ্যে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর অংশকে আলাদা করার প্রশ্নটি জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

অন্যদিকে, SC/ST-এর ক্ষেত্রে ‘ক্রিমি লেয়ার’ প্রয়োগের প্রশ্নটি আলাদা বিষয়। বর্তমানে ‘ক্রিমি লেয়ার’ নীতি মূলত OBC সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। SC/ST-এর ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক চলছে। এই দুই প্রশ্ন—উপশ্রেণিকরণ এবং ক্রিমি লেয়ার—একসঙ্গে মিশে যাওয়াতেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।

ফলে সংরক্ষণ ইস্যুতে এখন শুধু বিরোধী দল বনাম কেন্দ্র নয়, NDA-র ভিতরেও প্রকাশ্য মতপার্থক্য সামনে চলে এসেছে। চিরাগ পাসওয়ান ও জিতন রাম মাঝির পাল্টাপাল্টি ইস্তফার দাবি আগামী দিনে বিহারের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন