পাকিস্তানে ফের বাড়ছে রাজনৈতিক টানাপোড়েন। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের (Shehbaz Sharif) নেতৃত্বাধীন সরকারের উপর একদিকে জোটসঙ্গী পাকিস্তান পিপলস পার্টি (PPP)-র চাপ, অন্যদিকে জেলবন্দি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে (Imran Khan) ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা। পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি (Bilawal Bhutto Zardari) স্পষ্ট জানিয়েছেন, দলের অভিযোগের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সেনেট ও জাতীয় পরিষদে সরকারের কোনও আইন পাসে তাঁদের দল সমর্থন করবে না। ফলে ইসলামাবাদের ক্ষমতার অলিন্দে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, শাহবাজ সরকারের উপর এই চাপ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
শাহবাজ শরিফের সরকার মূলত জোটের সমর্থনের উপর নির্ভরশীল। সেই জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক পিপিপি। ফলে বিলাওয়ালের এই অবস্থান নিঃসন্দেহে সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ। তাঁর দলের অভিযোগগুলি দ্রুত মেটানো না হলে সংসদে সরকারের একাধিক বিল আটকে যেতে পারে। তাতে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
কাশ্মীরের সাম্প্রতিক নির্বাচনকে ঘিরেও পিপিপির সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বেড়েছে। নির্বাচনে অনিয়ম ও যোগসাজশের অভিযোগ তুলেছে দলটি। বিলাওয়ালদের দাবি, নির্বাচনী ফলাফলের বিরুদ্ধে তাঁরা আইনি পথে চ্যালেঞ্জ জানাবেন। ফলে জোটের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এখন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা আইনি ও সাংসদীয় ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই শাহবাজ সরকারের জন্য আরও বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছেন ইমরান খান। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে জেলবন্দি রয়েছেন পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (PTI) নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলছে এবং দীর্ঘদিন ধরে তাঁর মুক্তির দাবিতে সরব তাঁর দল ও সমর্থকেরা।
সম্প্রতি ইমরানের শারীরিক অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়। তাঁর আইনজীবীর দাবি ছিল, জেলে থাকাকালীন তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছে। বিষয়টি আদালতে ওঠার পর পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of Pakistan) ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর নির্দেশ দেয়।
সেই নির্দেশ অনুযায়ী ইমরানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানা যায়। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শের পর তাঁকে ফের কারাগারে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর। ফলে তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। একইসঙ্গে এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপও বেড়েছে সরকারের উপর।
ইমরানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও তাঁর সঙ্গে দেখা করেন বলে খবর। তাঁর বোন জেলের কনফারেন্স রুমে প্রায় ১৫ মিনিট সাক্ষাৎ করেন। তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবির (Bushra Bibi) সঙ্গেও দেখা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। তবে ওই সাক্ষাতে কী আলোচনা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে আসেনি।
ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিষয়টি ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্কতা রয়েছে। ফলে তাঁর পরিবার প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য না করলেও ইমরানের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি যে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, তা স্পষ্ট।
একদিকে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির নেতৃত্বে পিপিপির চাপ, অন্যদিকে ইমরান খানের স্বাস্থ্য ও তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা—দুই দিক থেকেই শাহবাজ সরকারের উপর চাপ বাড়ছে। বিরোধী দলগুলি যদি কোনও যৌথ মঞ্চ তৈরি করে, তাহলে সরকারের সামনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
তবে এই মুহূর্তে শাহবাজ সরকারের পতনের কোনও নিশ্চিত ইঙ্গিত নেই। পিপিপি এখনও ক্ষমতাসীন জোটের অংশ এবং তাদের অবস্থান কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, সেটিও স্পষ্ট নয়। ফলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সমীকরণ আগামী কয়েক সপ্তাহে কোন দিকে মোড় নেয়, তার উপরই নির্ভর করবে শাহবাজ সরকারের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।




