দীর্ঘদিনের পাহাড় সমস্যা নিয়ে শনিবার, ২২ অগস্ট শিলিগুড়ির সুকনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের (Amit Shah) সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসছেন দার্জিলিং পাহাড়ের জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা। বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’ (Permanent Political Solution)। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির দেওয়া প্রতিশ্রুতির পর এই বৈঠককে ঘিরে পাহাড়ে প্রত্যাশা আরও বেড়েছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবিকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়েছে দার্জিলিং পাহাড়। বিভিন্ন সময়ে দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল (DGHC) এবং গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (GTA)-এর মতো প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ের একাংশের কাছে এখনও মূল দাবি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান। এবার অমিত শাহ নিজে বৈঠক ডাকায় নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে সেই প্রশ্ন।
বৈঠকে পাহাড়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যা নিয়ে একাধিক দাবি উঠতে পারে। স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি GTA-র ভবিষ্যৎ, পাহাড়ের পুরসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচন, উন্নয়নমূলক কাজ এবং স্বচ্ছ নিয়োগের মতো বিষয়ও আলোচনায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। পাহাড়ের যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও নেতাদের আলোচনার তালিকায় থাকতে পারে।
অমিত শাহের বৈঠকে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা (Raju Bista), গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার (GJM) সভাপতি বিমল গুরুং (Bimal Gurung) এবং সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরি (Roshan Giri)-সহ পাহাড়ের একাধিক প্রতিনিধি থাকার কথা। রাজ্যের অর্থ ও পরিবহন দফতরের প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মনেরও উপস্থিত থাকার সম্ভাবনার কথা জানা গিয়েছে।
বৈঠকটি হচ্ছে সুকনার সেই এলাকায়, যেখানে অমিত শাহ তাঁর উত্তরবঙ্গ সফরের সময় অবস্থান করছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তিন দিনের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবেই পাহাড়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এই আলোচনাকে দেখা হচ্ছে। একই সফরে তিনি সীমান্ত নিরাপত্তা এবং কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ নিয়েও একাধিক বৈঠক করছেন।
পাহাড়ের বিজেপি বিধায়কদের বক্তব্যেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের দাবি স্পষ্ট। দার্জিলিংয়ের বিধায়ক নোমান রাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা উন্নয়নের কাজ দ্রুত শুরু করা, GTA-সহ স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর নির্বাচন এবং স্বচ্ছ নিয়োগের মতো বিষয় বৈঠকে তোলা হবে। তাঁদের মূল দাবি, পাহাড় সমস্যার একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের রূপরেখা দ্রুত সামনে আনা।
দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তাও আগেই জানিয়েছেন, বিজেপি পাহাড়ের জন্য যে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের পথে এগোতে চায়। নির্বাচনের আগে অমিত শাহও পাহাড়ের সমস্যার সাংবিধানিক সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কেন্দ্র ইতিমধ্যেই দার্জিলিং, তরাই ও ডুয়ার্সের সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য পঙ্কজ কুমার সিংকে (Pankaj Kumar Singh) interlocutor বা সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ করেছে।
বিমল গুরুংদের গোর্খা জনমুক্তি মোর্চাও সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পাহাড় সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছে। জুলাইয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) সঙ্গে বৈঠকেও গুরুং ও রোশন গিরি এই বিষয়টি সামনে এনেছিলেন। সেই আলোচনায় GTA-র বিকল্প আরও স্থায়ী কোনও প্রশাসনিক কাঠামোর প্রসঙ্গও উঠেছিল।
তবে ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। পাহাড়ের বিভিন্ন সংগঠনের দাবিতেও রয়েছে পার্থক্য—কেউ পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবি জানাচ্ছে, আবার কেউ ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আনার দাবি তুলছে। ফলে অমিত শাহের সঙ্গে শনিবারের বৈঠকে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, সমাধানের কাঠামো নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট বার্তা আসে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে পাহাড়।
সব মিলিয়ে, অমিত শাহের এই বৈঠক পাহাড়ের রাজনীতিতে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে এবার কেন্দ্র কোনও সময়সীমা, আলোচনার পরবর্তী ধাপ বা রাজনৈতিক সমাধানের রূপরেখা দেয় কি না, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। পাহাড়বাসীর প্রত্যাশা, এই বৈঠক যেন আর পাঁচটা বৈঠকের মতো শুধু আশ্বাসে শেষ না হয়ে বাস্তব সমাধানের পথে প্রথম বড় পদক্ষেপ হয়ে ওঠে।



