৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ মামলায় অবশেষে গুরুত্বপূর্ণ রায় জানাল কলকাতা হাই কোর্ট। ৩২ হাজার শিক্ষক নিয়ে বহু বিতর্ক, তদন্ত ও রাজনৈতিক তর্কের মাঝেও আদালত স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল— কিছু দুর্নীতি অবশ্যই প্রমাণিত, কিন্তু তার ফলে চাকরি হারাতে হবে না হাজার হাজার কর্মরত শিক্ষককে। হাই কোর্টের মতে, বিচ্ছিন্ন বেনিয়মের দায়ে ৩২ হাজার শিক্ষক-এর জীবন ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা ন্যায়সঙ্গত নয়।
এই মামলাটি গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম আলোচিত নিয়োগ মামলা। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, ঘুষ এবং বেআইনি পদ্ধতির অভিযোগ নিয়ে রাজ্যজুড়ে যে তুমুল বিতর্ক ছড়ায়, তার কেন্দ্রেই ছিল এই ৩২ হাজার শিক্ষক নিয়োগ। তবে বুধবার বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চ রায়ে জানিয়ে দেন— দুর্নীতি হয়েছে, কিন্তু সবার চাকরি বাতিল করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
কিছু দুর্নীতি হয়েছে! ৩২ হাজার চাকরি বাঁচিয়ে আর কী বলল আদালত
ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ আরও গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের মতে, ২০১৬ থেকে ২০২৫— প্রায় ৯ বছর ধরে যাঁরা পরিষেবা দিয়েছেন, তাঁদের হঠাৎ চাকরি হারালে তা শুধু তাঁদের নয়, তাঁদের পরিবারকেও ভয়াবহভাবে প্রভাবিত করবে। নিয়োগের সময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠেনি। বরং কয়েকজনের বেনিয়ম পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কলঙ্কিত করলেও, তার দায় ৩২ হাজার কর্মরত শিক্ষককে বহন করতে বাধ্য করা যায় না।
এই রায়ের সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়ে গেল প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্দেশ, যেখানে তিনি ৩২ হাজার শিক্ষক-এর চাকরি একযোগে বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশের বিরুদ্ধে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ আপিল করেছিল ডিভিশন বেঞ্চে। বহুদিন শুনানি চলার পর উচ্চ আদালত জানিয়ে দিল— শিক্ষকরা আগের মতোই কাজ চালিয়ে যাবেন।
রায়ের কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তা ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও আসে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “চাকরি দেওয়া দরকার, খেয়ে নেওয়া নয়।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট— নিয়োগে দুর্নীতির তদন্ত চলবে, কিন্তু কর্মরত শিক্ষকদের স্থায়ী অনিশ্চয়তায় রাখা যাবে না।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের টেটের ভিত্তিতে ২০১৬ সালে মোট ৪২,৫০০ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ হয়েছিল রাজ্যে। সেই নিয়োগে একাধিক বেনিয়ম ধরা পড়ায় মামলা দায়ের হয়। বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের রায় অনুযায়ী ৩২ হাজারের চাকরি বাতিলের নির্দেশ আসে। পরে ডিভিশন বেঞ্চ অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয় এবং সুপ্রিম কোর্টও সেই রায়ের উপর স্থগিতাদেশ জারি করে জানায়— চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।
একাধিক বাধা, বিচারপতির সরে দাঁড়ানো এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর অবশেষে মামলাটি ফের শুনানি ও রায়ের পর্যায়ে পৌঁছায়। বুধবারের রায়ে আদালত স্পষ্ট জানায়— দুর্নীতি হয়েছে এবং তদন্ত চলবে, কিন্তু তার প্রভাব ৩২ হাজার শিক্ষক-এর চাকরিতে পড়বে না। তাঁদের চাকরি বহাল থাকবে।
আদালতের এই মন্তব্য শুধু শিক্ষকদের স্বস্তি দেয়নি, রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও নতুন স্থিরতা ফিরিয়েছে। বহু শিক্ষকের পরিবারে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের অবসান ঘটল। একই সঙ্গে নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতির তদন্তও চলবে— যা ভবিষ্যতে রাজ্য সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই রায় দেখিয়ে দিল— দুর্নীতিকে শাস্তি দেওয়া জরুরি, কিন্তু তাতে নির্দোষদের ভবিষ্যৎ বিপর্যস্ত করা ন্যায়বিচার নয়।







