অসমের জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী জুবিন গার্গের (Zubeen Garg) মৃত্যু ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্যে এক বড় মোড় এল। শনিবার অসম পুলিশ জানায়, তদন্তের দায়িত্বে থাকা বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) অবশেষে পেয়েছে নয়াদিল্লির সেন্ট্রাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি (CFSL) থেকে পাঠানো ভিসেরা রিপোর্ট (Viscera Report)। এই রিপোর্টে এমন তথ্য রয়েছে যা তাঁর মৃত্যু বিষক্রিয়াজনিত ছিল কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।
১৯ সেপ্টেম্বর, সিঙ্গাপুরে একটি বিলাসবহুল ইয়ট পার্টিতে সাঁতার কাটার সময় ডুবে যান অহমীয়া সঙ্গীতের এই আইকন। প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল এটি একটি দুর্ঘটনা, কিন্তু মৃত্যুর পর থেকেই শুরু হয় গভীর তদন্ত। SIT-এর মতে, ভিসেরা রিপোর্টের টক্সিকোলজি (Toxicology) বিশ্লেষণই এখন মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
ভিসেরা রিপোর্ট আসলে কী?
‘ভিসেরা’ বলতে মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (যেমন হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, যকৃৎ, কিডনি ইত্যাদি) বোঝায়। সন্দেহজনক মৃত্যু বা বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে, ময়নাতদন্তের সময় এই অঙ্গগুলির নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয় ফরেনসিক ল্যাবে। সেখানে টক্সিকোলজি পরীক্ষা করে দেখা হয় শরীরে কোনো ধরনের বিষ, মাদক বা ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ ছিল কি না।

এই রিপোর্ট থেকেই জানা যায়—মৃত্যুর পেছনে বিষক্রিয়া (Poisoning), ওষুধের ওভারডোজ বা অন্য কোনো রাসায়নিক উপাদান ভূমিকা রেখেছিল কি না। জুবিন গার্গের ক্ষেত্রেও একইভাবে রিপোর্টটি পাঠানো হয়েছে গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজে ময়নাতদন্তকারী বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের প্যানেলের কাছে। তাঁরা রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে আদালতে জমা দেওয়ার জন্য চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করছেন।
তদন্তে গতি আনল SIT, ৭ জন গ্রেফতার
অসম পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (CID) এবং SIT প্রধান মুন্না প্রসাদ গুপ্তা সাংবাদিকদের জানান, এই মামলায় এখনও পর্যন্ত ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বর্তমানে তারা পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। এছাড়াও, সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে নোটিস পাঠানো হয়েছে, যাঁরা ওই ইয়ট পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন।
এই ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ইতিমধ্যেই SIT-এর সামনে হাজির হয়ে জবানবন্দি দিয়েছেন। বাকিদেরও তদন্তে যোগ দিতে নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। SIT আশা করছে, এই বিদেশি সাক্ষ্য ও প্রমাণগুলো তদন্তকে আরও স্পষ্ট করবে।
আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা চাওয়া হয়েছে
মুন্না প্রসাদ গুপ্তা আরও জানান, তদন্তের স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের কাছে একটি এমএলএআর (MLAR) বা Mutual Legal Assistance Request পাঠানো হয়েছে। এই অনুরোধের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে সহায়তা করতে বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনি নিয়ম অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের সংস্থাগুলিই তাদের দেশে তথ্য ও সাক্ষ্য সংগ্রহের কাজ করবে।
এডিজিপি আশ্বস্ত করেছেন, মামলার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হবে।
আসামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোক ও প্রতীক্ষা
জুবিন গার্গ শুধু একজন গায়ক নন, অসমের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর হঠাৎ মৃত্যুতে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শোকের ছায়া নেমেছে। ভক্তদের একাংশ এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে প্রিয় শিল্পীর মৃত্যু শুধুই একটি দুর্ঘটনা। Viscera Report প্রকাশের পর তদন্তের পরবর্তী ধাপ নিয়ে তাঁদের আগ্রহ এখন তুঙ্গে।
অনেকে মনে করছেন, যদি রিপোর্টে বিষক্রিয়া বা মাদকজাতীয় উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়ে, তাহলে মামলার চরিত্র সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। অন্যদিকে, যদি কিছু না পাওয়া যায়, তাহলে প্রমাণ হবে এটি সত্যিই একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
তদন্তে নজর গোটা দেশের
এই ঘটনা শুধুমাত্র আসাম নয়, সারা দেশজুড়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। Google-এ ‘Zubeen Garg Viscera Report, জুবিন গার্গ মৃত্যু রহস্য, SIT Investigation’ ইত্যাদি কীওয়ার্ডে মানুষের সার্চ বেড়েছে বহুগুণে। সঙ্গীতপ্রেমীরা এখন একটাই উত্তর খুঁজছেন—কীভাবে মৃত্যু হল জুবিন গার্গের?
বিশেষজ্ঞদের মত
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিসেরা রিপোর্টের টক্সিকোলজি বিশ্লেষণ অনেক সময় মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। কারণ, বাহ্যিকভাবে যা দুর্ঘটনা বলে মনে হয়, তা আসলে পরিকল্পিত অপরাধও হতে পারে। তাই এই রিপোর্টকে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
Zubeen Garg-এর মৃত্যু রহস্য এখন নির্ভর করছে একটি ফরেনসিক রিপোর্টের উপর। SIT, আদালত, ভক্ত—সবাই অপেক্ষা করছেন সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য। রিপোর্টে কী বেরিয়ে আসে, তার উপর নির্ভর করবে তদন্তের ভবিষ্যৎ দিক।







