ময়মনসিংহে যুবক খুনে ধৃত বেড়ে ১০, অশান্তির আগুনে এখনও পুড়ছে বাংলাদেশ—হাদির খুনিরা অধরাই

হাদি হত্যার পর দেশজুড়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও খুন—সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের, শান্ত থাকার বার্তা ইউনূসের

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও তরুণ ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর থেকেই কার্যত আগুনের উপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার রাতে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাদির মৃত্যুসংবাদ দেশে পৌঁছনোর পর থেকেই একের পর এক অশান্তির ছবি সামনে আসছে। সরকারি ভবন, রাজনৈতিক কার্যালয়, সংবাদমাধ্যম এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান—কোনও কিছুই রেহাই পায়নি জনরোষের হাত থেকে।

এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই ময়মনসিংহে যুবককে পিটিয়ে খুন ও দেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় গ্রেফতার বেড়ে হয়েছে ১০। শনিবার রাতে এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। তবে হাদির হত্যাকারীরা এখনও অধরাই। খুনিদের গ্রেফতারির অগ্রগতি নিয়ে ক্ষুব্ধ ইনকিলাব মঞ্চ সরকারকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।

হাদি হত্যার পর দেশজুড়ে তাণ্ডব

গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হন হাদি। সরকারি উদ্যোগে তাঁকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হলেও শেষরক্ষা হয়নি। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই রাতভর অশান্তিতে জড়িয়ে পড়ে একাধিক এলাকা। ভাঙচুর করা হয় আওয়ামী লীগের কার্যালয়, আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় দেশের প্রথম সারির দুই সংবাদপত্র—প্রথম আলোডেলি স্টার–এর দফতরে।

পুড়িয়ে দেওয়া হয় ছায়ানট ভবন, উদীচীর কার্যালয়—যা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে গভীর আঘাত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। রাতভর হামলার মাঝেই প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস শান্ত থাকার আবেদন জানান, কিন্তু তা উপেক্ষিতই থেকে যায়।

ময়মনসিংহে যুবক খুনে ধৃত বেড়ে ১০, অশান্তির আগুনে এখনও পুড়ছে বাংলাদেশ—হাদির খুনিরা অধরাই

ময়মনসিংহে যুবক খুনে ধৃত বেড়ে ১০, অশান্তির আগুনে এখনও পুড়ছে বাংলাদেশ—হাদির খুনিরা অধরাই

ময়মনসিংহে যুবক খুন: ধৃত ১০

হাদির মৃত্যুর আবহে আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ময়মনসিংহে। ভালুকায় দীপুচন্দ্র দাস নামে ২৭ বছরের এক যুবককে জনতার হাতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর পর তাঁর দেহ গাছে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেই ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে।

শনিবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার দফতর থেকে জানানো হয়, এই ঘটনায় র‍্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে মোট ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। র‍্যাবের হাতে ধৃত সাত জন এবং পুলিশের হাতে ধৃত তিন জনের নামও প্রকাশ করা হয়েছে। নিহত দীপু স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন।

২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের

হাদির শেষকৃত্যের পর শনিবার বিকেলে শাহবাগে জমায়েত থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর পদত্যাগের দাবি ওঠে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র আবদুল্লা আল জাবের স্পষ্ট জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তের অগ্রগতি জনসমক্ষে জানাতে না পারলে পদত্যাগ করতে হবে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের।

একই সঙ্গে দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হলেও বিদেশি ও দেশীয় ষড়যন্ত্রের অভিযোগও তোলা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাদির দাফন ঘিরে বিতর্ক

শনিবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজ়ায় হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ইউনূস-সহ একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। পরে হাদির দেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে, কবি কাজী নজরুল ইসলাম–এর সমাধির পাশেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

এই সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নজরুল পরিবারের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে—ভবিষ্যতে কবির সমাধির নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

সংসদ ভবনে ঢোকার চেষ্টা, সেনার কড়া পাহারা

হাদির শেষকৃত্য চলাকালীনই সংসদ ভবনের সামনে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। বেলা আড়াইটে নাগাদ একাংশ বিক্ষুব্ধ জনতা সংসদ ভবনে ঢোকার চেষ্টা করলে সেনা বাধা দেয়। সংসদ চত্বর ঘিরে ফেলা হয় কড়া নিরাপত্তায়। পরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

বিএনপি নেতার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, শিশুর মৃত্যু

অন্য দিকে, লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় সাত বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের অন্য সদস্যেরা গুরুতর আহত। ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপি।

গণমাধ্যমের উপর হামলা, ‘আপসহীন’ বার্তা

এক দিন বন্ধ থাকার পর শনিবার ফের প্রকাশিত হয় প্রথম আলো ও ডেলি স্টার। ডেলি স্টারের প্রথম পাতায় একটিই শব্দ—‘Unbowed’। হামলার মুখেও মাথা না নোয়ানোর বার্তা দিয়েছে সংবাদপত্রটি। দুই সম্পাদককে ফোন করে সমর্থন জানিয়েছেন ইউনূস।

রাষ্ট্রপুঞ্জের উদ্বেগ

বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস। ২০২৬ সালের নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন