আর জি করের চেস্ট মেডিসিন বিভাগের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে নেমে বেশ কিছু দুর্নীতির হদিস পেয়েছে সিবিআই। তার মধ্যে অন্যতম কুকীর্তির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে হাসপাতালের মর্গে। জানা যাচ্ছে, মৃতদেহের সঙ্গে সহবাসের ভিডিয়ো তুলে রমরমিয়ে চলত ব্যবসা। ২০২১ সাল থেকে প্রায় প্রতিটি অর্থবর্ষেই অন্তত ৬০ থেকে ৭০টি করে মৃতদেহর কোনও হিসাব পাওয়া যায়নি। এমনকি গরমিল পাওয়া গিয়েছে দেহাংশ ও কঙ্কালের ক্ষেত্রেও। মৃতদেহের ব্যবচ্ছেদ, সেলাই থেকে শুরু করে শ্মশান পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য নূন্যতম ১০ হাজার টাকার চুক্তি হত।
আর জি করের লাশকাটা ঘরে রহস্যের যেন কোন শেষ নেই! রাতের পর রাত সেখানে চলত অবৈধ কাজকর্ম। ধৃত সঞ্জয় রায় নামে সিভিক ভলান্টিয়ারের মর্গে ছিল অবাধ যাতায়াত। শুধু তাই নয়, বছরের পর বছর দুর্নীতির যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল তাঁদের চাঁইদের আনাগোনা বাড়ত রাত্রিবেলা। কিন্তু এখানেই একটা প্রশ্ন, রাতে তো ময়নাতদন্ত হয় না, তাহলে মর্গ কেন খোলা থাকত? আর তা খোলা থাকলেও সেখানে একজন সিভিক ভলান্টিয়ার এবং হাসপাতালের কয়েকজন কর্মী প্রবেশ করে কীভাবে? এই ধরনের জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করত কারা?
সিবিআই সূত্রে খবর, সঞ্জয়ের মোবাইল থেকে এমন কিছু ভিডিয়ো পাওয়া গিয়েছে, যা আর জি কর মেডিকেল কলেজের মর্গের ভেতরের। সেখানে মরদেহের সঙ্গে সঞ্জয়ের সহবাসের ছবি মিলেছে। অনেকেই জানেন, ‘নেক্রোফিলিয়া’ অর্থাৎ মৃতদেহের সঙ্গে সহবাস করা এক ধরনের বিকৃত মানসিক ব্যাধি। এই রোগে অনেকেই আক্রান্ত। তবে সবাই সেই সুযোগ পান না। সঞ্জয় পেয়েছিলেন। কিন্তু সঞ্জয় মরদেহের সঙ্গে সহবাসের ভিডিয়ো কেন মোবাইলে বন্দি করে রাখতেন?
গোয়েন্দাদের সন্দেহ, পর্নোগ্রাফি চক্রের সঙ্গে সঞ্জয় বা এই সিন্ডিকেটের যোগাযোগ ছিল। যেখানে মোটা টাকার বিনিময়ে এই সমস্ত ভিডিয়ো বিদেশে বিক্রি হতো বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি আরও একটি যে তথ্য উঠে এসছে, ২০২১ সাল থেকে বিগত তিন বছরে প্রতিটি অর্থবর্ষেই অন্তত ৬০ থেকে ৭০টি করে দেহের হিসাব পাওয়া যায়নি। সবথেকে বেশি সমস্যা দেহাংশ নিয়ে। মৃতদেহ থেকে কঙ্কাল বার করে নিয়ে আলাদাভাবে বিক্রি হত বলে সন্দেহ গোয়েন্দাদের।
সিবিআই সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, মর্গের ভেতরের নকশা, কোল্ড চেম্বার, রেজিস্টার খাতা, শেষ কয়েক মাসের সিসিটিভি সংগ্রহ করা হয়েছে। মেডিসিনের বিভাগীয় প্রধান প্রবীর চক্রবর্তীর কাছে রেজিস্টার খাতার গরমিল নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে সিবিআই। যদিও তিনি কোনো রকম সদুত্তর দিতে পারেননি বলেই সূত্রের দাবি। প্রথমবার সিবিআই জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সাড়া দিলেও এই মুহূর্তে তিনি ফোনও ধরছেন না, বা কোনও মেসেজের উত্তর দিচ্ছেন না।
আর জি কর কাণ্ডের সবচেয়ে বেশি করে যে বিষয়টা উঠে আসছে তা হল ‘উত্তরবঙ্গ’ লবির প্রভাব। মর্গ তৈরির সময় থেকে যিনি হেড ডোম ছিলেন তাঁকে মৌখিক নির্দেশে অন্য বিভাগের সরিয়ে দিয়েছিলেন প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ। সেখানে আনা হয়েছিল উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজের এক ডোমকে। অভিযোগ, তাঁর দুর্নীতির আখড়াতে পরিণত হয়েছিল। মর্গের দেহ ব্যবসা থেকে যে টাকা রোজগার হতো তা চলে যেত সিন্ডিকেটের মাথাদের কাছে।
আসলে আর জি কর মেডিকেল কলেজের মর্গের অভিযোগের অন্ত নেই। আরও জানা যাচ্ছে, প্রতিদিন সাধারণত সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা থেকে রাত আটটার মধ্যে মর্গ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর সেই মূল দরজার চাবি থাকে হেড ডোমের কাছে। রাত বিরেতে যদি কোনও মৃতদেহ আসে সেই দেহকে মর্গে আনার জন্য কেবলমাত্র পেছনের দরজা খুলে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু অভিযোগ, শেষ কয়েক মাস ধরে গভীর রাত পর্যন্ত তদন্তকারীদের সন্দেহ গভীর রাতেই কোল্ড চেম্বার থেকে বার করা হত। মৃতদেহ তারপর চলল সহবাস। যা মোবাইলে ক্যামেরাবন্দি করা হত। যদিও কারা এই কাজে সরাসরি যুক্ত এবং এই চক্রের শিকড় কতদূর বিস্তৃত তা এখনও জানতে পারেননি তদন্তকারীরা।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেছেন, এই ঘটনার সবারই জানা। আমরা এর আগে অনেকবার অভিযোগ করেছি মর্গের ভেতরে বসে মদ খাওয়া চলত। কিন্তু আমাদের মত ছোটখাটো কর্মীদের কিছু বলার সাহস ছিল না। অন্যায় দেখলেও চুপ করেই থাকতে হত। বলতে গেলেই হয় বদলি, নয় চাকরি যাওয়ার হুমকি দেওয়া হত।



