তেজস দুর্ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার মাঝে এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি তদন্ত-রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। দুবাই এয়ার শো চলাকালীন ভারতের তৈরি লাইট কমব্যাট এয়ারক্র্যাফট তেজস আচমকাই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভেঙে পড়ে। প্রাণ হারান উইং কমান্ডার নমনশ স্যায়াল। দুর্ঘটনার ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে, আর তাতেই উঠে আসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—তেজস কি কৌশলের সময় প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে পড়েছিল, নাকি শেষ মুহূর্তের ইঞ্জিন ব্যর্থতাই মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়?
শুক্রবার দুবাই স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৮ মিনিটে বিমানটি ভেঙে পড়ার পর ভারতীয় বায়ুসেনা প্রথম বিবৃতি জারি করে পাইলটের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। ভিডিওতে দেখা যায়, আকাশে ঘুরতে ঘুরতে তেজস হঠাৎ তীব্র গতিতে নিচের দিকে নামছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তীব্র শব্দে মাটিতে আছড়ে পড়ে জেটটি, সঙ্গে সঙ্গেই আগুনের শিখা ও কালো ধোঁয়ার স্তম্ভ দেখা যায় দূর থেকে।


তেজস দুর্ঘটনা আরও বিতর্ক তৈরি করেছে দুর্ঘটনার আগের দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো খবরকে ঘিরে। দাবি করা হয়েছিল, দুবাই এয়ার শো–তে থাকা তেজস এমকে১–এর জ্বালানি লিক করছে। ছবি-ভিডিওও ছড়িয়েছিল। পরে PIB জানায়, ভিডিওতে দেখা তরল আসলে পানি, নিয়মমাফিক প্রক্রিয়ার অংশ—গুজব মাত্র। এর একদিন পরই ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
তেজস দুর্ঘটনা: শূন্যে উল্টে গিয়ে আর সোজা হতে পারেনি জেট, ঠিক কী ঘটেছিল আকাশে?
সম্পূর্ণ ভারতীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত তেজস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য লাইট কমব্যাট এয়ারক্র্যাফট হিসেবে বিবেচিত হয়। ২৪ বছরের সার্ভিসে মাত্র দু’বার নথিভুক্ত দুর্ঘটনা ঘটেছে। ফলে তেজস দুর্ঘটনা—এই শব্দটাই বিশেষজ্ঞদের জন্য অস্বাভাবিক।
তাহলে আকাশে কী ঘটল?


বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, পাইলট একটি ধ্রুপদী এয়ার-ম্যানুভার, ‘ব্যারেল রোল’ প্রদর্শন করতে গিয়েছিলেন। যুদ্ধে বা এয়ার শো–তে বহুল ব্যবহৃত এই প্রদর্শনীতে জেট উল্টে গিয়ে আবার সোজা হয়ে গোলাকার কক্ষপথে ঘোরে। অভিজ্ঞ পাইলটের জন্য এটি খুব কঠিন নয়। তবে সাময়িকভাবে পাইলটকে উল্টো অবস্থানে থাকতে হয়, যেখানে মাথা নিচে, পা ওপরে থাকে।
সম্ভবত উল্টে যাওয়ার সেই অবস্থাতেই তেজসের যান্ত্রিক ভারসাম্যের সমস্যা হয়েছিল—এমনই অনুমান বিশেষজ্ঞদের।
দেখা যায়, পাইলট প্রথমে জেটকে অনেক ওপরে তুলেছিলেন, তারপর উল্টে যান। কিন্তু উল্টে যাওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যেই জেট দ্রুত নিচের দিকে নামতে থাকে। এরপর আর সোজা হয়ে ওপরে উঠতে পারেনি। ফলে বোঝা যাচ্ছে, খুব কম উচ্চতায় ঘটেছিল এই সংকট, যেখানে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ প্রায় শূন্য।
কিছু এভিয়েশন বিশেষজ্ঞের মতে, ব্যারেল রোল শেষে সোজা হয়ে ওঠার জন্য যে নির্দিষ্ট গতির প্রয়োজন হয়, তেজসের তখন সেই গতি ছিল না। অন্যদিকে, আরেকটি অনুসন্ধানমূলক মত বলছে, শেষ মুহূর্তে ইঞ্জিনে আগুন ধরে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যদিও তেজস ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি, তার ইঞ্জিন এসেছে আমেরিকার জেনারেল ইলেকট্রিক সংস্থা থেকে। তাই ইঞ্জিন ব্যর্থতার প্রশ্নও আলোচনার কেন্দ্রে।

তেজস দুর্ঘটনা এখন তদন্তাধীন। চূড়ান্ত রিপোর্ট আসার আগে কারণ সম্পর্কে নিশ্চয়তা নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের হিসেব অনুযায়ী, পাইলটের দক্ষতা নিয়ে সন্দেহ নেই। বরং কৌশল সম্পূর্ণ করার জন্য পর্যাপ্ত উচ্চতা না পাওয়া, অথবা হঠাৎ কোনও হার্ডওয়্যার ব্যর্থতা—দুটিকেই সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
যে কারণই হোক, ভারতের অন্যতম আধুনিক যুদ্ধবিমান তেজসের এই দুর্ঘটনা দেশকে শোকস্তব্ধ করেছে, আর আকাশে সেই শেষ মুহূর্তের ব্যর্থতার রহস্য এখন তদন্তকারীদের হাতেই।








