বিল নিয়ে রাজ্যপাল ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বে গঠিত সাংবিধানিক বেঞ্চ জানিয়ে দিল, কোনও রাজ্যের আইনসভায় পাশ হওয়া বিল অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখা সঠিক নয়, তবে আদালত রাজ্যপাল বা রাষ্ট্রপতিকে সময়সীমা বেঁধে দিতে পারে না। এই রায়কে বর্তমান কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি বিক্রম নাথ, বিচারপতি পিএস নরসিংহ ও বিচারপতি এ এস চন্দরকের সমন্বয়ে গঠিত পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানায়, কোনো বিল রাজ্যপালের সামনে গেলে তাঁর সামনে তিনটি সাংবিধানিক বিকল্প খোলা থাকে। তিনি বিলে সই করতে পারেন, সেটিকে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে পারেন, অথবা সম্মতি না দিয়ে তা ফের বিধানসভায় পাঠাতে পারেন। এই তিনটির মধ্যে কোনটি বেছে নেবেন, তা একান্তই রাজ্যপালের সিদ্ধান্ত; আদালতের নয়।
অনির্দিষ্টকাল বিল আটকে রাখা ঠিক নয়, তবে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া যাবে না: সুপ্রিম কোর্ট
তবে শীর্ষ আদালত একইসঙ্গে সতর্ক করেছে—রাজ্যপাল বা রাষ্ট্রপতি যদি কোনও যৌক্তিক কারণ ছাড়া দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকেন, বিল ফাইল জমে পড়ে থাকে বা সিদ্ধান্ত নিতে অস্বাভাবিক বিলম্ব হয়, সেক্ষেত্রে আদালত সীমিত পরিসরে হস্তক্ষেপ করতে পারে। দায়িত্ব পালনে তাঁদের তৎপর করার জন্য আদালত ‘সীমিত নির্দেশ’ দিতে পারে বলেও স্পষ্ট জানানো হয়।

এই রায় আসে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল রেফারেন্স’ মামলার শুনানিতে, যেখানে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সুপ্রিম কোর্টের কাছে ১৪টি সাংবিধানিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। এর আগে তামিলনাড়ু সরকারের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যপাল ও রাষ্ট্রপতির জন্য তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল, যা নিয়ে আপত্তি ওঠে কেন্দ্রীয় ও সাংবিধানিক মহলে। উপরাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে একাধিক সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তোলেন—আদালত কি রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপতিকে নির্দেশ দিতে পারে? সেই প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি মুর্মু শীর্ষ আদালতের পরামর্শ চান।
সুপ্রিম কোর্ট বৃহস্পতিবার জানায়, সংবিধানের ১৪৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে আদালতের মতামত চাওয়ার সুযোগ দেয়, কিন্তু প্রত্যেকবার মতামত চাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। একই সঙ্গে ২০১ অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতির সামনে দুটি পথ খোলা—বিলে সই করা বা নাকচ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সংবিধান কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা দেয়নি। ফলে আদালতও সে সময়সীমা চাপিয়ে দিতে পারে না।
তবে আদালত পুনর্ব্যক্ত করেছে—বিল আইনে পরিণত হওয়ার আগেই যদি রাজ্যপাল বা রাষ্ট্রপতি কোনও সিদ্ধান্ত নেন, তা আদালতে সাধারণত চ্যালেঞ্জ করা যায় না। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ক্রিয়তা থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে, কারণ সেই অবস্থায় সংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত ঘটে।
এই রায় কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্কের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিভিন্ন রাজ্যে বহু বিল দীর্ঘদিন ধরে রাজভবনে আটকে থাকা নিয়ে বিরোধী দলগুলি রাষ্ট্রপালদের বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ করে। আবার কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বলা হয়ে থাকে—রাজ্যপাল সংবিধান অনুযায়ী তাঁর কর্তব্য পালন করছেন। শীর্ষ আদালতের নতুন রায় এই দ্বন্দ্বে সাংবিধানিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে একটি মধ্যপথ তুলে ধরল।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই রায় স্পষ্ট করল যে রাজ্যপাল বা রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের সময়সীমা আদালত ঠিক করতে না পারলেও, অনির্দিষ্ট বিলম্ব আর চলবে না। সংবিধানিক কর্তব্য পালনে নিষ্ক্রিয়তা দেখালে আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারবে।
আগামী দিনে কেন্দ্র–রাজ্য দ্বন্দ্ব এবং রাজভবন বনাম রাজ্য সরকারের টানাপোড়েনে এই রায়ের প্রভাব আরও প্রকট হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।







