৬.৫ কোটি দিলেই শোধ ২২ হাজার কোটির ঋণ! স্বস্তি পেলেন ‘নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম’ জি মিডিয়ার কর্নধার

২২,০০৬.৫৭ কোটি টাকার স্বীকৃত দাবির বিপরীতে মাত্র ৬.৫ কোটি টাকার রেজোলিউশন প্ল্যান অনুমোদন করেছে NCLT। ঋণদাতাদের প্রায় ৯৯.৯৭ শতাংশ হেয়ারকাটের কারণ কী?

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: মাত্র ৬.৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেই প্রায় ২২,০০৬.৫৭ কোটি টাকার ঋণদায় থেকে নিষ্পত্তির পথে জি গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সুভাষ চন্দ্র (Subhash Chandra)। ব্যক্তিগত দেউলিয়া সংক্রান্ত মামলায় তাঁর প্রস্তাবিত রেজোলিউশন প্ল্যানে অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইব্যুনাল (NCLT)। ফলে পাওনাদারদের প্রায় ৯৯.৯৭ শতাংশ ‘হেয়ারকাট’ মেনে নিতে হচ্ছে—অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা পাওনার বিপরীতে মিলবে আনুমানিক ৩ পয়সা।

বিষয়টি সামনে আসতেই দেশের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিগত ইনসলভেন্সি মামলাগুলির মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ, সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে স্বীকৃত দাবির পরিমাণ যেখানে ২২ হাজার কোটিরও বেশি, সেখানে প্রস্তাবিত মেটানো টাকার অঙ্ক মাত্র ৬.৫ কোটি।

NCLT-তে মামলাটি শুনানির সময় কয়েক জন ঋণদাতা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিল LIC Housing Finance-ও। সংস্থাটির স্বীকৃত দাবি ছিল প্রায় ১,৩২২.৩৯ কোটি টাকা, অথচ প্রস্তাবিত অর্থপ্রাপ্তির পরিমাণ প্রায় ৩৮ লক্ষ টাকা

LIC Housing Finance-এর যুক্তি ছিল, এত বিপুল দাবির বিপরীতে এই সামান্য অর্থপ্রাপ্তি কার্যত নগণ্য। প্রস্তাবটিকে ‘অকার্যকর ও বেআইনি’ বলেও আপত্তি জানানো হয়েছিল বলে NCLT-র আদেশে উল্লেখ রয়েছে।

তবে আপত্তি জানানো ঋণদাতাদের ভোটের অংশ ছিল ২০ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে, ৮০.৮১ শতাংশ ভোটের প্রতিনিধিত্বকারী ঋণদাতারা এই রেজোলিউশন প্ল্যানের পক্ষে মত দেন। সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেই ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে, ঋণদাতাদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের জায়গায় বসে নিজের বিচারে নতুন অঙ্ক নির্ধারণ করা তার কাজ নয়।

এই মামলায় NCLT-র মূল বিবেচনার জায়গা ছিল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—৬.৫ কোটি টাকা গ্রহণ না করে ঋণদাতারা কি বাস্তবে আরও বেশি টাকা উদ্ধার করতে পারতেন? ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ, সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত সম্পদের মূল্যায়নে দেখা গিয়েছে, সেই সম্পদের মূল্য প্রস্তাবিত অর্থের তুলনায়ও যথেষ্ট কম হতে পারে।

অর্থাৎ, রেজোলিউশন প্ল্যান বাতিল করে তাঁকে দেউলিয়া প্রক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিলে ঋণদাতাদের হাতে আরও বেশি টাকা আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং সেই পরিস্থিতিতে আর্থিক সম্পদ থেকে উদ্ধার আরও কম হতে পারে বলেই NCLT মনে করেছে।

মামলার সূত্রপাত অবশ্য আরও আগে। Vivek Infracon-এর নেওয়া ১৭০ কোটি টাকার ঋণের ব্যক্তিগত গ্যারান্টার ছিলেন সুভাষ চন্দ্র। ঋণটি অনাদায়ী হওয়ার পর Indiabulls Housing Finance তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ইনসলভেন্সির মামলা শুরু করে।

২০২২ সালে মামলা দায়ের হয়। এরপর জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ইনসলভেন্সি প্রক্রিয়া গ্রহণ করে। এর মধ্যে Indiabulls Housing Finance-এর নাম পরিবর্তন হয়ে Sammaan Capital হয়েছে।

এর আগে বিষয়টি মেটানোর একটি উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) IBC-র সংশ্লিষ্ট বিধানগুলির বৈধতা বহাল রাখার পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইনসলভেন্সি প্রক্রিয়াটি ফের সক্রিয় হয়।

NCLT-র এই সিদ্ধান্ত অবশ্য বিতর্কমুক্ত নয়। আইনজীবী অভিষেক স্বরূপের মতে, ৯৯ শতাংশের বেশি হেয়ারকাটকে নিছক ‘কমার্শিয়াল উইজডম’ বলে মেনে নেওয়া যায় না। তাঁর বক্তব্য, ঋণদাতাদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তেরও অন্তত কিছুটা বাণিজ্যিক যুক্তি থাকা প্রয়োজন।

তবে ট্রাইব্যুনালের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে IBC-র একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি—ঋণদাতাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যখন কোনও রেজোলিউশন প্ল্যান অনুমোদন করে, তখন NCLT সাধারণত সেই বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের জায়গায় নিজের বিচার বসাতে পারে না, যদি সিদ্ধান্তটি আইনি কাঠামোর মধ্যে থাকে।

এই অনুমোদনের ফলে ২২,০০৬.৫৭ কোটি টাকার পুরো দাবি ভবিষ্যতে একই প্ল্যানের অধীনে পরিশোধ করা হবে—এমন নয়। বরং ইনসলভেন্সি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঋণদাতারা কতটা অর্থ উদ্ধার করতে পারবেন, এই রেজোলিউশন প্ল্যান কার্যত তারই নিষ্পত্তি করছে।

মামলাটি এখন ফের মূল ডিভিশন বেঞ্চে যাবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি হওয়ার কথা। সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত ইনসলভেন্সি প্রক্রিয়ায় এটি বড় আইনি অগ্রগতি হলেও ঋণদাতাদের জন্য ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা—২২ হাজার কোটির বেশি স্বীকৃত দাবির বিপরীতে মাত্র ৬.৫ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকার পাওনায় আনুমানিক তিন পয়সা উদ্ধারের প্রস্তাবই এখন সামনে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন