মধ্যপ্রদেশের ছোট শহর মোহও থেকে হরিয়ানার ফরিদাবাদ—এই দীর্ঘ পথচলার মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে সিদ্দিকি ব্রাদার্সের উত্থান। কখনও ‘লগ্নিকারীদের টাকা ফেরাতে না পারা’, কখনও প্রতারণার অভিযোগ, কখনও আবার স্টার্ট-আপ ব্যর্থতার কাহিনি—সবকিছুকে পেছনে ফেলে কীভাবে মাত্র দুই দশকে আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়–এর শীর্ষে পৌঁছলেন জাভেদ আহমেদ সিদ্দিকি ও হামুদ আহমেদ সিদ্দিকি? ঠিক এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি।
১০ নভেম্বর দিল্লি বিস্ফোরণ মামলার পরে প্রথমবার আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম সামনে আসে। ধৃতদের কয়েকজনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগসূত্র এবং তথাকথিত ‘সুইসাইড বম্বার’ উমর-উন-নবির ইউনিভার্সিটি কানেকশন তদন্তকে নতুন মোড় দেয়। এরপরই ED বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল, অর্থের উৎস এবং আর্থিক নথি খতিয়ে দেখতে শুরু করে।
ইতিমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান ও ‘প্রতিষ্ঠাতা’ জাভেদ সিদ্দিকিকে তলব করেছে দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ। অভিযোগ—পুরনো প্রতারণা মামলার নথি গোপন রাখা। অন্যদিকে, তাঁর ভাই হামুদ সিদ্দিকিকে হায়দরাবাদে ২০ বছরের পুরনো বিনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দু’জনকেই জেরা করছে বিভিন্ন সংস্থা। তদন্তকারীদের প্রশ্ন—যে পরিবার ২০০১ সালে আর্থিক চাপে পড়ে মোহওর ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল, সেই পরিবার কয়েক বছরের মধ্যে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হয়ে উঠল?
পুলিশের পুরনো নথি অনুযায়ী, সিদ্দিকি পরিবারের মূল ভিত্তি ছিল মধ্যপ্রদেশের মোহও-র কায়স্থ মহল্লা। বাবা মহম্মদ হাম্মাদ সিদ্দিকি ছিলেন এলাকার সম্মানীয় কাজি। তাঁর সামাজিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দুই ভাই—জাভেদ এবং হামুদ—১৯৯০-এর দশকের শেষে একটি ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি খোলেন। সেনা কর্মী, ব্যবসায়ী, স্থানীয় পেশাজীবীরা সেখানে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন সিদ্দিকিদের কথায় আশ্বাস পেয়ে।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সংস্থাটি ডুবে যায়। বিনিয়োগকারীদের ৩ লক্ষ টাকারও বেশি ফেরত দেওয়া হয়নি, এমন অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের মতে, সেই সময়েই শুরু হয় দুই ভাইয়ের সংঘাত—দু’জনেই পরস্পরকে দোষারোপ করেন। অভিযোগের চাপে পড়ে ২০০০–২০০১ সালের দিকে পরিবারটি রাতারাতি মোহ ছেড়ে দিল্লিতে চলে যায়।
মধ্যপ্রদেশ পুলিশের এক কর্তা বলেন,
“আমরা ভেবেছিলাম পরিবারটি দুবাইয়ে চলে গেছে। পরে ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ে হায়দরাবাদে হামুদের খোঁজ পাই।”
তদন্তে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। মোহও ছাড়ার পর জাভেদ ‘আল ফালাহ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি’ নামে নতুন সংস্থা শুরু করেন। একইসঙ্গে তৈরি হয় আল ফালাহ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট, যার ভিত্তিতেই পরবর্তীতে গড়ে ওঠে আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়। বিরাট অঙ্কের তহবিল কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে স্বল্প সময়ে এত জমি ও পরিকাঠামো তৈরি হল—এখন সেটাই তদন্তের মূল কেন্দ্র।
দিল্লি বিস্ফোরণের ঘটনায় ধৃতদের কয়েকজনের আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সম্পর্ক, এবং সন্ত্রাসে অর্থ সরবরাহের সম্ভাব্য সন্দেহ এখন তদন্তকে আরও গুরুতর করেছে। ED ও পুলিশ দু’দিকেই নজর রাখছে—
এক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের উৎস,
দুই, সিদ্দিকি পরিবারের অতীত আর্থিক অপরাধ।
স্থানীয়দের মতে, সিদ্দিকি ব্রাদার্স অতীতে লগ্নিকারীদের ঠকিয়েছিলেন। আবার সেইরকমই অভিযোগ আজও উঠছে বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত আর্থিক নথি নিয়ে। তদন্তকারীরা বলছেন,
“সিদ্দিকিদের উত্থান অনেকটাই রহস্যে মোড়া। ২০ বছরে যেভাবে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হলেন, তার আর্থিক হিসেব মিলছে না।”
মধ্যপ্রদেশ থেকে দিল্লি, তারপর ফরিদাবাদ—প্রতারণা মামলার তলায় চাপা থাকা সিদ্দিকি ব্রাদার্সের অতীত এখন একে একে সামনে আসছে। আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে ওঠার কাহিনি কি শুধুই ‘চ্যারিটেবল ট্রাস্টের সাফল্য’, নাকি এর পিছনে রয়েছে বেআইনি অর্থচক্র? খুব শিগগিরই তার উত্তর দেবে তদন্ত।







