রানিগঞ্জের এক হাইস্কুলে ছাত্রকে বিবস্ত্র করে ভিডিও করার অভিযোগ সামনে এসেছে, যা ঝড় তুলেছে শিক্ষা মহলে। ঘটনায় মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে বাড়িতেই আত্মহত্যার চেষ্টা করে নবম শ্রেণির ওই ছাত্র। পরিবারের দাবি, হুমকি দিয়ে স্কুলের বাথরুমে ডেকে নিয়ে বিবস্ত্র ভিডিও তোলে একদল যুবক এবং পরে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার সত্যতা স্থানীয়ভাবে যাচাই করা না গেলেও, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরেই পড়ুয়ার মানসিক ভেঙে পড়া ও আত্মহত্যার চেষ্টার কথা জানিয়েছেন তার অভিভাবকেরা। গুরুতর পরিস্থিতি সামলে ছাত্রটিকে বাঁচাতে সক্ষম হন তার বাবা।
স্কুলের বাথরুমে ছাত্রকে বিবস্ত্র করে ভিডিও, আত্মহত্যার চেষ্টা, রানিগঞ্জে চাঞ্চল্য
পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে রানিগঞ্জ থানায় লিখিত নালিশ দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি জানানো হয়েছে স্কুলের টিচার ইনচার্জকেও। লিখিত অভিযোগে ছাত্রটির বাবা জানিয়েছেন, কয়েকদিন আগে থেকেই ছেলেকে নিয়ে একাধিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল।
জানা গিয়েছে, ওই ছাত্র তার হোয়াটসঅ্যাপ ডিসপ্লে পিকচারে নবম শ্রেণির এক ছাত্রীর ছবি দিয়ে ‘মাই ওয়াইফ’ লিখেছিল। বিষয়টি নিয়ে আপত্তি ওঠায় সে ছবিটি সরিয়ে দিলেও বিতর্ক থামেনি। মানসিক চাপে কয়েকদিন স্কুলেও যেতে পারেননি ওই ছাত্রী। দুই পরিবার নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
কিন্তু অভিযোগ, এরপরেই ১৩ নভেম্বর স্কুলের বাথরুমে নিয়ে গিয়ে ওই ছাত্রকে নগ্ন করে ভিডিও ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিলে মারাত্মক অপমানবোধে ভেঙে পড়ে পড়ুয়া। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের পরিচয় নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। তারা আসানসোলের এক কলেজের ছাত্র বলে জানা গেলেও, অভিযোগ অস্বীকার করেছে তারা। তাদের দাবি, ভিডিওটির সঙ্গে কোনও সংযোগ নেই।
পুলিশ ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তকারীদের বক্তব্য, ঘটনা অত্যন্ত সংবেদনশীল। দুই পরিবার এবং দুই অল্পবয়সি ছেলে–মেয়ে জড়িত থাকায় কোনও তাড়াহুড়ো না করে, সবদিক খতিয়ে দেখে তদন্ত এগোচ্ছে পুলিশ।
এরই মধ্যে থানায় ডেকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছে তদন্তকারী অফিসাররা। একইসঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষও ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে আলোচনায় বসেছেন। স্কুলের শিক্ষক সুভাষপ্রসাদ জানিয়েছেন, স্কুলের দুটি ক্যাম্পাসে মাত্র এক জন গ্রুপ-ডি কর্মী কাজ করেন। ফলে নজরদারির ঘাটতি থেকে থাকতে পারে।
মনোবিদ ও চিকিৎসকরা বলছেন, এই ঘটনা শুধু স্কুলে নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়—এটি শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যেরও গুরুতর সংকেত।
আসানসোলের বিশিষ্ট মনোবিদ দেবাঞ্জন সাহার মতে, নিয়মিত ছাত্র–শিক্ষক–অভিভাবকদের সঙ্গে মনোবিদদের সেশন থাকা জরুরি। আত্মহত্যা প্রতিরোধ, মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং মোবাইল অ্যাডিকশন নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বিষয় সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মনোবিদ ঈশিতা সান্যালের মতে, নবম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা বয়সগতভাবে পুরো পরিপক্ক নয়। তাই মোবাইল ব্যবহার, সোশ্যাল মিডিয়ার ঝুঁকি এবং ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষার গুরুত্ব নিয়ে স্কুলে আরও সচেতনতা দরকার। অনেক স্কুলে মনোবিদ না থাকলে মাঝে মধ্যে বিশেষজ্ঞ এনে বা ভার্চুয়াল সেশনের মাধ্যমে আলোচনা করা উচিত বলে মত তাঁর।
রানিগঞ্জের এই ঘটনা আবারও স্কুল পরিমণ্ডলে সাইবার বুলিং, শারীরিক লাঞ্ছনা, এবং ছাত্রদের মানসিক নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল। তদন্তের অগ্রগতি এখন সকলের নজরকাড়া।







