যুদ্ধ আবহে জ্বালানি-জ্বালা, লালকেল্লা থেকে ২০৪৭-এর ‘আত্মনির্ভর ভারত’ বার্তা মোদির

৮০তম স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্য সামনে রাখলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের আবহে আত্মনির্ভরতার বার্তাও দিলেন তিনি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

৮০তম স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে বড় স্বপ্ন দেখার বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)। ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্যের কথা ফের সামনে এনে তাঁর দাবি, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ ও জ্বালানি-সংকটের মতো প্রতিকূলতার মধ্যেও ভারতকে আত্মনির্ভর হয়ে উঠতে হবে। একইসঙ্গে গত ১২ বছরের সরকারের কাজের খতিয়ান তুলে ধরে প্রতিরক্ষা উৎপাদন, সেমিকন্ডাক্টর, প্রযুক্তি ও দেশীয় উৎপাদনে জোর দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

লালকেল্লার ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছোট স্বপ্ন নিয়ে আর এগিয়ে চলার সময় নেই। তাঁর কথায়, বড় স্বপ্নই দেশের চিন্তার পরিধি বাড়ায় এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রয়োজন দৃঢ় সংকল্প। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ভারতকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।

মোদি বলেন, কোনও দেশ তখনই বড় লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, যখন তার মানুষের মধ্যে স্বপ্ন, সংকল্প এবং নিজেদের শক্তির উপর আস্থা থাকে। প্রতিকূল পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, সংকল্প দৃঢ় থাকলে সেই পরিস্থিতির মধ্যেই এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিন ফের ২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যের কথা মনে করিয়ে দেন মোদি। স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তির সময় ভারতকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার যে লক্ষ্য তিনি আগেই সামনে রেখেছিলেন, এদিনের ভাষণেও তারই পুনরাবৃত্তি করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে গত এক যুগে দেশের অর্থনীতি ও পরিকাঠামোগত পরিবর্তনের কথাও। ২০৪৭-এর লক্ষ্য পূরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি আত্মনির্ভরতার উপর জোর দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর দাবি, গত ১২ বছরে দেশের ২৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে উঠে এসেছেন। একই সময়ে ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলির অন্যতম হয়ে উঠেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করে উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী।

শুধু বড় শিল্প নয়, ছোট যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে বড় পণ্য—সবকিছুর দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন মোদি। তাঁর বক্তব্য, ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ পণ্যের মানের সঙ্গে কোনও আপস করা চলবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে গুণমানের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আত্মনির্ভরতার প্রসঙ্গ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে অন্য দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে বার্তা দেন তিনি। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘স্বদেশি’ এবং ‘লোকাল ফর লোকাল’-এর মতো উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।

প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও আত্মনির্ভরতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন মোদি। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর চিপকে আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। ইলেকট্রনিক্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে পরিবহণ—প্রায় সমস্ত আধুনিক ব্যবস্থাতেই চিপের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে ভারতের অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে ইতিমধ্যে বড় সেমিকন্ডাক্টর কারখানাগুলিতে উৎপাদনের কাজ এগিয়েছে এবং আগামী কয়েক বছরে আরও একাধিক ইউনিট চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে প্রযুক্তি ও উৎপাদন ক্ষেত্রে বিদেশ-নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি রফতানির ক্ষেত্রেও ভারত আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।

এদিনের ভাষণে বিরোধীদেরও নিশানা করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করার অভিযোগ। তিনি বলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সংঘাতের জেরে দেশে গ্যাস ও পেট্রলের জোগান বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা ছড়ানো হয়েছিল। কৃষকদের ইউরিয়া পাওয়া নিয়েও ভয় দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মোদির দাবি, সম্ভাব্য সংকটের কথা মাথায় রেখেই ভারত আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়েছিল। ফলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেও দেশের সাধারণ মানুষের যাতে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে না হয়, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা, উৎপাদন এবং প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতার প্রসঙ্গকে তাই এদিনের ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে সামনে রাখেন প্রধানমন্ত্রী।

সব মিলিয়ে ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে মোদির ভাষণের মূল সুর ছিল দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা এবং ২০৪৭-এর লক্ষ্য। যুদ্ধ, জ্বালানি-অনিশ্চয়তা ও বিশ্ব অর্থনীতির চাপের মধ্যেও ভারতকে নিজের শক্তির উপর দাঁড় করানোর বার্তাই এদিন বারবার উঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন