আফগান সীমান্তে আবারও ভয়াবহ হামলা। পাকিস্তানের আফগান সীমান্তে টিটিপি হামলা নতুন করে অস্থির করে তুলেছে পুরো অঞ্চলকে। সোমবার গভীর রাতে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের কুররম জেলায় পাক সেনা ঘাঁটিতে অতর্কিতে হামলা চালায় তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান বা টিটিপি। হামলায় এখনও পর্যন্ত ৬ জন পাক সেনার মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। এই ঘটনার পর প্রশ্ন জোরাল হচ্ছে—আফগান সীমান্তের অস্থিরতা কি এবার পাকিস্তানকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে?
হামলার সময় সেনা ঘাঁটিতে হঠাৎ করেই শুরু হয় গুলিবৃষ্টি। পাক সেনারা পালটা জবাব দিলেও আগ্নেয়াস্ত্র আর ভারী গোলাবারুদের চাপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগে। দীর্ঘ গুলির লড়াইয়ের পর পাঁচ জওয়ান ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান। পরে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন আরও একজন। তবে হামলায় টিটিপি জঙ্গিরা হতাহত হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
আফগান সীমান্তে টিটিপি হামলা, মৃত ৬ পাক সেনা, পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা
পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দাবি, তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান গত কয়েক বছরে নতুন করে সংগঠিত হয়েছে এবং আফগানিস্তানের মদতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে তাদের প্রভাব অনেক বেড়েছে। খাইবার পাখতুনখোয়া, কুররম, উত্তর ওয়াজিরিস্তান, বালুচিস্তান—সব জায়গাতেই দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব রয়েছে। আর এই অসন্তোষকেই কাজে লাগাচ্ছে টিটিপি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফগানিস্তানে তালিবানের ক্ষমতা প্রত্যাবর্তনের পর পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। কারণ, সীমান্তের দুই প্রান্ত জুড়েই বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে সশস্ত্র নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্ক আবারও সক্রিয় হয়ে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে।
এই অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় কারণ এখান দিয়েই গেছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC)। টিটিপির বারংবার হামলায় চীনের বিনিয়োগ এবং করিডোরের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গত জুনে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলায় ১৬ জন পাক সেনা নিহত হন। এরপর থেকেই সীমান্তবর্তী এলাকায় টিটিপি আরও আগ্রাসী হয়েছে।
ঘটনার পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সেনা প্রধানের মন্তব্য—দেশকে অস্থিতিশীল করতে বিদেশি মদতপুষ্ট শক্তিরা ষড়যন্ত্র করছে। তবে বিরোধীদের মতে, সরকার ও সেনাবাহিনীর নীতি-ভুল এবং সীমান্তনীতি ব্যর্থ হওয়ায় টিটিপি আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, পাকিস্তানের আফগান সীমান্তে টিটিপি হামলা যদি এই গতিতে চলতে থাকে, তাহলে খাইবার পাখতুনখোয়া ও বালুচিস্তান জুড়ে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নাগরিক সমাজের বক্তব্য—রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে, তাই বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি আরও উৎসাহী হয়ে উঠছে।
মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত পাক সেনাবাহিনী এলাকা ঘিরে রেখেছে। সীমান্ত সিল করে শুরু হয়েছে জঙ্গি তল্লাশি অভিযান। কিন্তু সংশয় থেকেই যাচ্ছে—এই অভিযান কি টিটিপিকে থামাতে পারবে? নাকি পাকিস্তান আরও গভীর অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে?
বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, সীমান্তের অগ্নিগর্ভ পরিবেশ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা একসঙ্গে মিলেই পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বড়সড় সংঘাত ডেকে আনতে পারে। একটি পরমাণু-সজ্জিত দেশের এমন বিপজ্জনক অস্থিতিশীলতা এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।







