সিনেমা মুক্তির আগে সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন (CBFC)-এর ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। কিন্তু OTT প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত কনটেন্টের ক্ষেত্রে সেই ধরনের পূর্ব-সার্টিফিকেশনের ব্যবস্থা নেই। এবার ডিজিটাল বিনোদনের এই ক্ষেত্রেই নজরদারির কাঠামো তৈরির উদ্যোগ সামনে এল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS)-এর তরফে। সঙ্ঘপ্রধান মোহন ভাগবতের (Mohan Bhagwat) আগের বক্তব্যের সূত্র ধরে একটি প্যানেল তৈরি হয়েছে, যারা OTT কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে প্রস্তাব তৈরি করবে।
দু’বছর আগেই OTT কনটেন্ট নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন ভাগবত। ২০২৪ সালের বিজয়া দশমীর ভাষণে তিনি মোবাইল ফোনে শিশুদের হাতে পৌঁছে যাওয়া বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, কিছু ডিজিটাল কনটেন্ট সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণ হয়ে উঠছে এবং বিজ্ঞাপন ও আপত্তিকর ভিজ্যুয়াল কনটেন্টের ক্ষেত্রে আইনি নজরদারি প্রয়োজন।
সেই বক্তব্যের প্রায় দু’বছর পর এবার বিষয়টি নিয়ে সাংগঠনিক স্তরে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে তৈরি হওয়া প্যানেলে শিক্ষা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত কয়েক জন প্রাক্তন উপাচার্য এবং RSS-এর প্রচারক রয়েছেন। গত মাসে ওই প্যানেলের প্রথম বৈঠকও হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
প্যানেলের মূল লক্ষ্য, OTT প্ল্যাটফর্মে কী ধরনের কনটেন্ট নিয়ে নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারির প্রয়োজন হতে পারে, তার একটি কাঠামো তৈরি করা। সেই প্রস্তাব পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
সঙ্ঘের সূত্রের বক্তব্য, OTT-র জন্য এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা অনেকটা চলচ্চিত্রের সেন্সর ব্যবস্থার মতো নজরদারি করতে পারে। তবে সেটি আদৌ আলাদা কোনও কর্তৃপক্ষ হবে, নাকি বর্তমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই নতুন কোনও ব্যবস্থা তৈরি করা হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
প্রস্তাব তৈরির আগে আইনজীবী, ডিজিটাল মিডিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করার কথাও উঠে এসেছে। কবে এই প্রস্তাব চূড়ান্ত হবে বা সরকারের কাছে জমা পড়বে, তার কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
তবে OTT নিয়ন্ত্রণের এই ভাবনাকে ঘিরে ভিন্ন মতও সামনে এসেছে। পরিচালক কিউ, যিনি ‘তাসের দেশ’-এর জন্য পরিচিত, প্রশ্ন তুলেছেন—মানুষের শিক্ষা, খাদ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করার পর OTT নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত কি না। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম, সরকার যদি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে অন্য ধরনের নির্দেশ বা নিয়ন্ত্রণ নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে।
অন্যদিকে বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর বক্তব্য, স্মার্টফোন এখন খুব সহজেই নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে শিশুকিশোররা কী ধরনের ডিজিটাল কনটেন্ট দেখছে, তার উপর নজর রাখার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতিতে OTT-র কনটেন্ট নিয়ে নজরদারি জরুরি।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, OTT বর্তমানে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। ২০২১ সালের Information Technology (Intermediary Guidelines and Digital Media Ethics Code) Rules-এর Part III-তে অনলাইন কিউরেটেড কনটেন্ট বা OTT প্ল্যাটফর্মের জন্য একটি Code of Ethics এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কাঠামো রয়েছে।
এর পাশাপাশি বেআইনি কনটেন্টের ক্ষেত্রে Information Technology Act, 2000-এর বিভিন্ন ধারাতেও ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৬ সালের জুলাইয়ে লোকসভায় জানিয়েছিল, গত দুই বছরে অশ্লীল কনটেন্ট এবং একাধিক আইনের বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে ভারতে ৫০টি OTT প্ল্যাটফর্মের জনসাধারণের অ্যাক্সেস বন্ধ করা হয়েছে।
সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই পদক্ষেপের ক্ষেত্রে Information Technology Act-এর ৬৭ ও ৬৭A ধারা, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (Bharatiya Nyaya Sanhita)-র ২৯৪ ধারা এবং Indecent Representation of Women (Prohibition) Act, 1986-এর ৪ নম্বর ধারার মতো আইনি বিধান বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ OTT কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি পথ বর্তমানে রয়েছে।
এখানেই নতুন বিতর্কের জায়গা। RSS-এর প্রস্তাবিত কাঠামো যদি শেষ পর্যন্ত সরকারের কাছে পৌঁছয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—বর্তমান অভিযোগ-ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হবে, নাকি সিনেমার মতো OTT কনটেন্টের জন্য আলাদা কোনও পূর্ব-নজরদারি বা সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিশুদের সুরক্ষা এবং ডিজিটাল কনটেন্টের নিয়ন্ত্রণ—তিনটি বিষয়ই জড়িয়ে রয়েছে।
ফলে এখনই OTT-তে নতুন ‘সেন্সর বোর্ড’ তৈরি হচ্ছে বলা যাচ্ছে না। আপাতত RSS-এর উদ্যোগে তৈরি প্যানেল একটি সম্ভাব্য নজরদারি কাঠামো নিয়ে আলোচনা করছে এবং সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেই প্রস্তাব কী হয় এবং কেন্দ্র তা আদৌ গ্রহণ করে কি না, তার উপরই নির্ভর করবে OTT নিয়ন্ত্রণে পরবর্তী পদক্ষেপের দিক।



