বিহারের রাজনীতিতে এক নতুন ইতিহাস রচনা করলেন নীতীশ কুমার। বৃহস্পতিবার পাটনার ঐতিহাসিক গান্ধী ময়দানে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দশম বারের জন্য শপথ নিলেন তিনি। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজ্যের রাজনীতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার পর এ শপথগ্রহণ তাঁর রাজনৈতিক শক্তি এবং প্রভাবের নতুন প্রমাণ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ NDA–র শীর্ষ নেতারা। উপস্থিত ছিলেন লজেপি (রামবিলাস), হ্যাম, আরএলএমসহ জোটের সহযোগী দলগুলির প্রতিনিধিরাও। পাটনার গান্ধী ময়দান এর আগেও ২০০৫, ২০১০ এবং ২০১৫ সালে নীতীশ কুমারের শপথগ্রহণের সাক্ষী হয়েছিল। এবারও সেই একই মাঠে দাঁড়িয়ে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার আবার নতুন অধ্যায় শুরু করলেন।
দশম বার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার, শপথ নিলেন গান্ধী ময়দানে
বুধবার JD(U)–র নতুন বিধায়কদের বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে তাঁকে নির্বাচিত করা হয় বিধানসভার দলনেতা হিসেবে। এরপর NDA–র বিধায়কদলের বৈঠকেও তাঁকে নেতা হিসেবে মনোনীত করা হয়। নতুন সরকার গঠনের আগে এই ঐক্যমত্য তাঁর নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাই ইঙ্গিত করে।

বিজেপির বিধায়কদলের বৈঠকেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। সম্রাট চৌধুরীকে নেতা এবং বিজয় কুমার সিন্হাকে উপনেতা নির্বাচিত করা হয় (দুজনেই শপথ নিলেন উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে)। কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মউর্য, যিনি এই মনোনয়নের প্রস্তাব দেন।
২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনকে অনেকেই নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা বলেই মনে করছিলেন। কিন্তু ফলাফলে তিনি শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণই নন, বরং আরও একবার প্রমাণ করলেন, বিহারের রাজনীতি গত দুই দশক ধরে তাঁর চারপাশেই ঘোরে। ৭৪ বছরের এই নেতা প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন ২০০৫ সালে। মাঝখানে ২০১৪–১৫ সালে সংক্ষিপ্ত নয় মাস ক্ষমতার বাইরে থাকলেও, বাকি সময়টায় তিনি একাধিকবার জোটবদল করেও নিজের সরকার টিকিয়ে রেখেছেন।
এবারের নির্বাচনে NDA–র ভূমিকম্পসদৃশ জয় রাজনৈতিক মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। মোট ২৪৩ আসনের মধ্যে NDA পেয়েছে ২০২টি আসন, যা দ্বিতীয়বারের মতো ২০০–র বেশি আসন পাওয়ার সাফল্য। ২০১০ সালে NDA–র ঝুলিতে ছিল ২০৬ আসন।
বিজেপি জিতেছে ৮৯, JD(U) পেয়েছে ৮৫, LJPRV পেয়েছে ১৯, হ্যাম ৫ এবং আরএলএম ৪ আসন। বিপরীতে মহাগঠবন্ধনের অবস্থা ছিল ভীষণ শোচনীয়। RJD পেয়েছে মাত্র ২৫টি আসন, কংগ্রেস ৬, CPI(ML)(L) ২, IIP ১ এবং CPI(M) ১। AIMIM পেয়েছে ৫ আসন, BSP পেয়েছে ১।
এই বিপুল জয়ের পর স্পষ্ট, জনগণের আস্থা এখনও NDA–র ওপরই বেশি, এবং তাদের নেতৃত্বে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নীতীশ কুমার–এর অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল দুই দফায়—৬ ও ১১ নভেম্বর। ভোটের হার ছিল রেকর্ড ৬৭.১৩%, যা ১৯৫১ সালের পর সর্বাধিক। উল্লেখযোগ্যভাবে মহিলাদের ভোটের হার পুরুষদের থেকেও বেশি—৭১.৬% বনাম ৬২.৮%।
এই রায় শুধু NDA–র জয়ের প্রতীক নয়, বরং নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক প্রভাব, সংগঠন দক্ষতা ও জনমুখী ইমেজেরও প্রতিফলন। বিহারের নাগরিকরা আবারও দায়িত্ব তুলে দিলেন সেই নেতার হাতে, যিনি দুই দশক ধরে রাজ্যকে নিজের নেতৃত্বে ধরে রেখেছেন।







