নজরবন্দি ব্যুরো: নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের ধাক্কায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ল। বৃহস্পতিবার রাতের আপডেট অনুযায়ী, আট জেলায় উদ্ধার হওয়া দেহের সংখ্যা ৩৮৯-এ পৌঁছেছে বলে Nepal Police সূত্রে খবর। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে এখনও চলছে তল্লাশি; একইসঙ্গে নতুন করে তৈরি হওয়া একটি বিশাল ‘বেরিয়ার লেক’ থেকে ফের বন্যার আশঙ্কায় ভোতে কোশী নদীর তীরবর্তী এলাকায় সতর্কতা জারি হয়েছে।
বুধবার সকালে নেপালের রসুয়া জেলার রাসুওয়াগাধি সীমান্ত এলাকায় আচমকাই ভয়াবহ জলস্রোত নেমে আসে। ভোতে কোশী নদীর জল অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে ফুলে উঠে ভাসিয়ে দেয় ঘরবাড়ি, যানবাহন, সেতু ও রাস্তা। পরে সেই জলস্রোত ভোতে কোশী, ত্রিশূলী এবং নারায়ণী নদী ব্যবস্থার নীচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথমদিকে বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তবে নেপালের Flood Forecasting Division-এর প্রাথমিক প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং ICIMOD-এর পর্যবেক্ষণে ইঙ্গিত মিলেছে, নদীর উজানে বরফ, পাথর ও ধসের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় ধরনের অবরোধ থেকেই আচমকা জলস্রোত তৈরি হয়েছিল। ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও বিশদ বিশ্লেষণ করছেন।
বিপর্যয়ের ভয়াবহতা বোঝা যায় নদীর গতিবেগ ও জলের উচ্চতা বৃদ্ধির হিসাবেও। নেপালের সরকারি প্রযুক্তিগত রিপোর্ট অনুযায়ী, কয়েকটি এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই নদীর জলস্তর বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়। প্রায় ১০ ঘণ্টার মধ্যে জলস্রোত ভোতে কোশী থেকে ত্রিশূলী হয়ে মুগলিন, মালেখু ও দেবঘাটের দিকে নেমে যায়।
এখনও বহু মানুষের কোনও খোঁজ নেই। বৃহস্পতিবার নেপালের National Disaster Risk Reduction and Management Authority-এর হিসাবে অন্তত ৮২৬ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না; তাঁদের মধ্যে নিরাপত্তাকর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকরাও রয়েছেন। পর্যটকদের মধ্যে ৪৭৬ জন বিদেশি এবং ১১৪ জন নেপালি ছিলেন বলে Nepal Tourism Board জানিয়েছিল।
ভারতীয়দের নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, নেপালের বিপর্যয়ের পর প্রায় ২৯০ জন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এঁদের মধ্যে পর্যটক, তীর্থযাত্রী এবং নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ভারতীয়রাও রয়েছেন। উদ্ধারকাজে ভারতও সহযোগিতা করছে।
এরই মধ্যে নতুন করে বিপদের আশঙ্কা তৈরি করেছে নেপাল-চিন সীমান্তের কাছে তৈরি হওয়া একটি বিশাল প্রাকৃতিক হ্রদ। Chhochen Khola এবং Purepu Tsangpo নদীর সংযোগস্থলের কাছে ধসের কারণে নদীর গতিপথ আটকে এই ‘বেরিয়ার লেক’ তৈরি হয়েছে। চিনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে বৃহস্পতিবার সকালে সেখানে প্রায় ২০ লক্ষ ঘনমিটার জল জমেছিল এবং জল উপচেও পড়ছিল।
চিনের জলসম্পদ মন্ত্রকের আশঙ্কা, আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লক্ষ ঘনমিটার জল ওই হ্রদে জমতে পারে। প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে আচমকা বিপুল জলরাশি নীচের দিকে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই কারণে ভোতে কোশী নদীর নীচের অংশে বসবাসকারী মানুষ, পর্যটক এবং উদ্ধারকর্মীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ‘ফের বান আসবে কি না’—তার নিশ্চিত উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে নেপালের National Disaster Risk Reduction and Management Authority জানিয়েছে, নতুন তৈরি হওয়া হ্রদটি ক্রমশ বাড়ছে এবং সেটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে নদীর তীরবর্তী এলাকায় আপাতত সতর্কতা বজায় রাখাই সবচেয়ে জরুরি।
নেপালের এই বিপর্যয়ের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়েও পড়েছে। নেপাল থেকে নেমে আসা নদীগুলির মধ্যে কোশী, গন্ডক-সহ একাধিক নদীর জলস্তর নিয়ে বিহারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কোশীর ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা প্রশাসনের চিন্তা বাড়াচ্ছে, কারণ প্রবল বন্যার সময়ে নদীর গতিপথে বড় পরিবর্তন ঘটার নজির রয়েছে।
অন্যদিকে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই বিপর্যয় হিমালয়ের ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতি এবং আকস্মিক জলবিপর্যয়ের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তবে এই মুহূর্তে চিনের কোনও নির্দিষ্ট জলবিদ্যুৎ বাঁধকে নেপালের বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে নিশ্চিত করার মতো তথ্য সামনে নেই। বরং প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে ধস, বরফ-পাথরের অবরোধ এবং তার ফলে আকস্মিক জলস্রোতের দিকেই নজর রয়েছে।
এখন নেপালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিখোঁজদের খোঁজ, দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজ এবং নদী তীরবর্তী মানুষকে নতুন বিপদ থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া। একের পর এক দেহ উদ্ধারের মাঝেও তাই উদ্ধারকারীদের লড়াই চলছে—কাদামাটি আর ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও কেউ জীবিত আছেন কি না, সেই আশাতেই।



