উত্তরবঙ্গ সফরে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় SIR বিতর্ক নতুন মাত্রা দিলেন। কোচবিহারের প্রশাসনিক সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী তীব্র ভর্ৎসনা করেন কেন্দ্রকে। তাঁর অভিযোগ, আগে দুই বছরে একবার SIR করা হলেও এখন অবৈজ্ঞানিক ও অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে নোটিস পাঠানো হচ্ছে, ফলে সাধারণ মানুষের ওপর তৈরি হচ্ছে অযথা চাপ এবং আতঙ্কের পরিবেশ।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আগে দুই বছরে SIR হত। এখন এত তাড়াতাড়ি কেন? কীসের এত তাড়া? কোন কমিশন যদি একপক্ষ হয়ে যায়, তাকে কী বলা হবে?” এই প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি সরাসরি কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপকে কাঠগড়ায় তুলেছেন।
তিনি জানান, গত কয়েক দিনে বিএলও ও এসডিওদের উদ্দেশে মধ্যরাতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, সাধারণ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে, আর এর দায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তগুলির ওপরেই বর্তায়।
কোচবিহারের প্রশাসনিক সভা থেকে SIR বিতর্কে কেন্দ্রকে তীব্র আক্রমণ মমতার
মমতার দাবি, উত্তরবঙ্গ, বিশেষত সীমান্তবর্তী কোচবিহার জেলাকে কেন্দ্র করে নানা বিভ্রান্তিকর পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় SIR বিতর্ক নিয়ে বলেন, মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা অমানবিক।
তিনি নমঃশূদ্র ও রাজবংশী সম্প্রদায়কে উদ্দেশ করে বলেন, “বাংলায় কোনও ডিটেনশন ক্যাম্প আমি থাকতে দেব না। অসমের কোনও অধিকার নেই বাংলার লোককে চিঠি পাঠানোর। পুলিশকে বলে দিচ্ছি, অন্য রাজ্যের কেউ এসে বাংলার সাধারণ মানুষকে তুলে নিয়ে যেতে পারবে না।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, অপরাধীর ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য হলেও সাধারণ মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ অন্যায়। তাঁর ভাষায়, “ক্রিমিনাল বললেই কেউ ক্রিমিনাল হয়ে যায় না।”
মমতা আরও উল্লেখ করেন, বাংলায় উর্দু, বাংলা, হিন্দি—সব ভাষাই সমানভাবে স্বীকৃত।
“বাংলায় কথা বললেই কেউ বাংলাদেশি? পাকিস্তানের ভাষা উর্দু। অনেকেই উর্দুতে কথা বলেন। তাহলে তাঁরা কোন দেশের?”—এই মন্তব্যে ভাষা-জাতিসত্তা বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেন মুখ্যমন্ত্রী।
সভা থেকে তিনি ভারত–পাকিস্তান–বাংলাদেশের আগের ইতিহাসও স্মরণ করান। জানান, ১৯৭১–এর চুক্তি অনুযায়ী বহু মানুষের নাগরিকত্ব বৈধ, অথচ আজ তাঁদেরই নোটিস পাঠানো হচ্ছে। তাঁর মতে, এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রাজবংশী ও নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ।
বিএলওদের পাশে থাকার বার্তাও দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সার্ভার সমস্যা ও ভুলভ্রান্তির কারণে অনেক নাম যেভাবে বাদ পড়ছে, তা অযৌক্তিক। একজন মানুষ এক জায়গাতেই ভোট দিতে পারেন—এটাই নিয়ম। পরিযায়ী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের তথ্য সংগ্রহে সরকারের পক্ষ থেকে আলাদা উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও ঘোষণা করেন তিনি।
মমতা বলেন, “হিয়ারিংয়ে অবশ্যই যাবেন। ‘May I Help You’ ক্যাম্প হবে সরকারের তরফে।”
পাশাপাশি কোচবিহারের মতো বর্ডার জেলায় আইনশৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী করার নির্দেশও দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, “অযথা মাতব্বরি বরদাস্ত হবে না। এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে হবে।”
উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি জানান, গত কয়েক বছরে পরিকাঠামো, সড়ক যোগাযোগ, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও পর্যটনখাতে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ ও নাগরিকত্ব সংশ্লিষ্ট বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অসহনীয় করে তুলছে বলেই অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
সব মিলিয়ে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় SIR বিতর্ক নিয়ে এই কঠোর অবস্থান আগামী দিনে রাজনীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—দুটিকেই নাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।







