মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রিকেটার—এই শব্দবন্ধ অনেকের কাছেই হয়তো নতুন। বাংলায় একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে: “একই অঙ্গে কত রূপ!” এই কথাটিই যেন সবচেয়ে মানানসই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে। রাজনীতির ময়দানে তিনি যেমন এক লড়াকু এবং দৃঢ়চেতা নেতা, তেমনই তাঁর পরিচয়ের তালিকায় রয়েছে কবি, চিত্রশিল্পী, সুরকার, গায়িকা—যে কোনও একটি পরিচয়েই বৃহৎ জায়গা করে নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন তিনি। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রিকেটার—এই পরিচয়টিই এতদিন আড়ালেই ছিল।
ঘটনার সূত্র রিচা ঘোষকে সংবর্ধনার মঞ্চে। গত শনিবার (৮ নভেম্বর) সিএবি-র পক্ষ থেকে ভারতের বিশ্বকাপজয়ী নারী ক্রিকেটার রিচা ঘোষকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় কলকাতায়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সকলেই জানেন, মুখ্যমন্ত্রী খেলাধুলোর প্রতি গভীর অনুরাগী। ফুটবল, ব্যাডমিন্টন থেকে টেনিস—বিভিন্ন ক্রীড়াক্ষেত্রে তাঁকে অতীতে দেখা গেছে। কিন্তু ক্রিকেট?



অনুষ্ঠানের সঞ্চালক এবং বর্ষীয়ান ক্রীড়া সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য হঠাৎই সেই গোপন অধ্যায়টি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি জানান, নব্বইয়ের দশকে সাংসদদের একটি বিশেষ ক্রিকেট ম্যাচে অংশ নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু অংশগ্রহণ নয়—ম্যাচসেরার খেতাব জিতেছিলেন তিনি।
তখন লোকসভার সাংসদ ছিলেন মমতা। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পি. আর. কুমারমঙ্গলমের নেতৃত্বে মাঠে নেমেছিল লোকসভার দল। প্রতিপক্ষে ছিল রাজ্যসভার দল। নারী-পুরুষ মিলিয়ে হয়েছিল সেই বন্ধুত্বপূর্ণ ম্যাচ। এবং সেখানেই ব্যাট-বল হাতে নজর কাড়েন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। লোকসভার দল ম্যাচ জেতে, আর মমতা হন ম্যাচসেরা।
এই তথ্যই প্রমাণ করে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রিকেটার পরিচয় শুধুমাত্র কৌতূহলের নয়, বরং বাস্তব এবং গৌরবময় ইতিহাসের অংশ।


বিগত দশক ধরে বাংলার খেলাধুলোকে এগিয়ে নিতে মুখ্যমন্ত্রী সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কলকাতার তিন প্রধান ফুটবল ক্লাব—ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান এবং মহমেডান—প্রায় প্রতি বছরই কোনও না কোনওভাবে রাজ্যের সহায়তা পেয়েছে। খেলোয়াড়দের সম্মান, স্টেডিয়াম উন্নয়ন—বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি উদ্যোগী হয়েছেন।

এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রিচা ঘোষ পেলেন শুধু প্রশংসাই নয়, আরও বড় প্রাপ্তি। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর হাতে তুলে দিলেন পুলিশ বিভাগের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট (DySP) পদে নিয়োগপত্র। শুধু তাই নয়, তাঁকে সম্মান জানানো হয় রাজ্যের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘বঙ্গ ভূষণ’ খেতাবে।
রিচার জীবনের অন্যতম সেরা দিন ছিল এটি। এক যুবতী, সিলিগুড়ির মাঠ থেকে উঠে এসে বিশ্বজয়ের শিখরে দাঁড়িয়ে, এবার রাজ্যের উচ্চ প্রশাসনিক পদেও প্রতিষ্ঠিত হলেন। মঞ্চে তাঁর চোখের উজ্জ্বলতা সেই অর্জনের সাক্ষ্য বহন করছিল।
এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আবহেই উঠে এল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রিকেটার রূপের গল্প। একটি গল্প, যা হয়তো আজ না-জানলে ইতিহাসের খাতায় ধুলোর নিচেই চাপা পড়ে থাকত।
আজ বাংলার নারী খেলোয়াড়দের অগ্রযাত্রা নতুন উচ্চতায়। রিচা ঘোষের পথচলা তার বড় প্রতীক। আর মমতার ক্রিকেট-অধ্যায় স্মরণ করিয়ে দেয়—নারী কখনোই শুধু দর্শক নয়, খেলোয়াড়, নেতৃত্বদাত্রী এবং সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দু—সবই হতে পারে।








