ভারতের মহানগরগুলির বায়ুর মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষত কলকাতার বায়ুদূষণ এ বছর নতুন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিল্লির মতো পরিস্থিতি না হলেও, নভেম্বর মাসে দেশের দূষণের তালিকায় পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে শহর। এই তথ্য সামনে আসতেই পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন—শীতের ঠিক শুরুতেই যদি এই মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তবে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড (CPCB)-এর তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে কলকাতার বাতাসে PM 2.5-এর গড় ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৮২ মাইক্রোগ্রাম, যা কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত নিরাপদ সীমার দ্বিগুণেরও বেশি। PM 2.5 হলো এমন এক দূষণকারী কণা, যা সহজেই শ্বাসনালীতে প্রবেশ করে এবং হৃদরোগ থেকে ফুসফুসের সংক্রমণ পর্যন্ত নানা জটিল রোগের কারণ হয়ে ওঠে।
কলকাতার বায়ুদূষণ বাড়ছে দ্রুত, নভেম্বরে দেশের পঞ্চম দূষিত শহর তিলোত্তমা
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দিল্লিতে নভেম্বরের গড় PM 2.5 স্তর পৌঁছে গিয়েছিল ২১৫ মাইক্রোগ্রাম–এ, যা দেশের মধ্যে সর্বাধিক। তার পরেই রয়েছে ভুবনেশ্বর, ভোপাল ও জয়পুর। সেই তালিকায় পঞ্চম স্থানে কলকাতার উপস্থিতি বিশেষ মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে পরিবেশ বিজ্ঞানীদের কাছে।
শীতকালে দূষণের দ্রুত বৃদ্ধি কোনো নতুন ঘটনা নয়। বিশেষজ্ঞদের দাবি, তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় বাতাস ভারী হয়ে পড়ে, এবং দূষিত কণা উপরের স্তরে উঠে যেতে না পেরে শহরের উপরেই আটকে থাকে। এই ইনভার্শন প্রক্রিয়া উত্তর ভারতের শহরগুলির মতোই পূর্বাঞ্চলের শহরগুলিকেও প্রভাবিত করে।

পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কলকাতার দূষণ শুধু এই শহরের কারণে নয়। তাঁর বক্তব্য, উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে যে দূষিত বাতাস ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি দিয়ে ভেসে আসে, তার বড় অংশই মিশে যায় কলকাতার বায়ুর সঙ্গে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শহরের বাড়তে থাকা গাড়ির সংখ্যা, কারখানার নির্গমন এবং আবর্জনা পোড়ানোর ধোঁয়া। ফলে বাতাসের মান দ্রুত নিম্নমুখী হয়।
পরিবেশবিদদের মতে, কলকাতার দূষণ নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষত যানবাহনের কালো ধোঁয়া কমাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও পর্যবেক্ষণ দরকার। একই সঙ্গে আবর্জনা পোড়ানো বন্ধ করা, নির্মাণকাজে ধুলো প্রতিরোধের নিয়ম কঠোরভাবে মানানো, এবং শিল্পাঞ্চলে নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা অত্যাবশ্যক।
শহরের বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তারা পরামর্শ দিচ্ছেন, দূষণের দিনে ভোরবেলা বা সন্ধ্যায় বাইরে ব্যায়াম না করতে এবং বাইরে বেরোলে মাস্ক ব্যবহার করতে।
এই পরিস্থিতি যে শুধুমাত্র পরিবেশগত নয়, তা স্পষ্ট। বায়ুদূষণ ক্রমশ কলকাতার জনস্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলছে। দিল্লির মতো অবস্থা এড়াতে চাইলে এখনই বড় মাপের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বিপর্যয় আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দূষণ কমাতে সরকারি সিদ্ধান্ত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নাগরিকদের সচেতনতাও সমানভাবে জরুরি। কারণ কলকাতার বায়ুদূষণ আজ আর কোনো এক দিনের সমস্যা নয়—এটি এক সর্বব্যাপী সঙ্কট, যা দ্রুত সমাধান না হলে মানুষের জীবনযাত্রাকেই বদলে দিতে পারে।







