দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিন সামলাতে হাওড়ার কৌশিকের শরণাপন্ন ভারতীয় ব্যাটাররা!

দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিনে ব্যাটাররা হিমশিম খাওয়ায় ভারতীয় দল ডেকেছিল বাংলার সব্যসাচী স্পিনার কৌশিক মাইতিকে। জাডেজাসহ দেশসেরা ব্যাটারদের দিয়েছেন কঠিন চ্যালেঞ্জ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিনে দিশেহারা ভারতীয় ব্যাটারদের ভরসা হয়ে উঠেছেন বাংলার সব্যসাচী স্পিনার কৌশিক মাইতি। দু’হাতে বল করার বিরল দক্ষতা, নিখুঁত লাইন-লেংথ এবং ধারাবাহিকতা—এই তিন গুণই তাঁকে টেনে আনল ভারতীয় দলের নেটে। ইডেনে দ্বিতীয় টেস্টের প্রস্তুতির জন্য ঐচ্ছিক অনুশীলনে মঙ্গলবার ডেকে নেওয়া হয় তাঁকে। শুরুতে যাঁর ক্রিকেটজীবন প্রায় থমকে গিয়েছিল, সেই হাওড়ার ছেলে এখন জাতীয় দলের ব্যাটারদের স্পিন মোকাবিলার ‘বিশেষ অস্ত্র’।

কৌশিকের গল্প যেন সিনেমার মতো। ছোটবেলায় ডান হাতে বল করতেন। কিন্তু অ্যাকশনে সমস্যা থাকায় কোচেরা বলেছিলেন, বাঁ হাতে চেষ্টা করতে। বাঁ হাতে বল করতে করতে তিনি বাংলা অনূর্ধ্ব-১৯ দলে পৌঁছে যান। কিন্তু থেমে থাকেননি। ডান হাতেও অনুশীলন চালিয়ে গিয়েছেন। এখন দু’হাতেই বল করতে পারেন—যা ভারতের মতো শক্তিশালী দলের অনুশীলনে তাঁকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে।

মঙ্গলবার ভারতীয় দলের নেটে দীর্ঘক্ষণ বল করেছেন কৌশিক মাইতি। বাঁহাতি ব্যাটারদের বিরুদ্ধে অফস্পিন, আর ডানহাতিদের বিরুদ্ধে বাঁ হাতে বল—এভাবেই তাঁর বিশেষত্ব। সাই সুদর্শন, ওয়াশিংটন সুন্দর, দেবদত্ত পাড়িক্কল এবং বিশেষ করে রবীন্দ্র জাডেজাকে দারুণ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন তিনি। বল করার সময় নেটের বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন গৌতম গম্ভীর এবং বোলিং কোচ মর্নি মর্কেল।

দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিন সামলাতে হাওড়ার কৌশিকের শরণাপন্ন ভারতীয় ব্যাটাররা!

অনুশীলন শেষে কৌশিক বলেন, ‘‘সিএবির প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। এ রকম সুযোগ আমার জীবনের বড় পাওয়া। ভারতীয় দলের নেটে বল করা মানেই নিজের দক্ষতা যাচাইয়ের বড় মঞ্চ। যে ভাবে দু’হাতে বল করি, সেভাবেই বল করেছি।’’ তিনি জানান, জাডেজা ও ওয়াশিংটন সুন্দর তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন—টি-টোয়েন্টিতে কীভাবে লেংথ বাড়াতে হবে, কীভাবে গতি বাড়িয়ে ব্যাটারের সময় কমিয়ে দিতে হবে। কৌশিক বলেন, ‘‘জাড্ডু ভাই বললেন, আমার স্বাভাবিক লেংথ ৪-৫ মিটার। ওটা বাড়িয়ে ৬-৭ মিটার করতে। বলের গতি বাড়াতে।’’

দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিন সামলাতে হাওড়ার কৌশিকের শরণাপন্ন ভারতীয় ব্যাটাররা!
দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিন সামলাতে হাওড়ার কৌশিকের শরণাপন্ন ভারতীয় ব্যাটাররা!

ভারতীয় ক্রিকেটারদের সাহায্য করার মতোই এই অভিজ্ঞতা কৌশিকের নিজের ক্যারিয়ারেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর লক্ষ্য এখন আইপিএল খেলা। রাজস্থান রয়্যালসের ট্রায়ালে ইতিমধ্যেই অংশ নিয়েছেন তিনি। ২০২৩ সালের বিজয় হজারে ১১ উইকেট নেওয়া এই স্পিনার জানেন—দরজা খুলতে সময় লাগতে পারে, তবে সুযোগ পেলে নিজেকে আরও উন্নত করতে পারবেন।

বাংলার হয়ে আটটি লিস্ট-এ ম্যাচ এবং তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন কৌশিক। তাঁর প্রাক্তন কোচ এবং জাতীয় নির্বাচক সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘কৌশিক খুব ছোটবেলায় আমার কাছে এসেছিল। অত্যন্ত প্রতিভাবান। দু’হাতে বল করা ওর সহজাত। চাপিয়ে কিছু শেখানো হয়নি।’’ সম্বরণ আরও বলেন, ‘‘একদিন দেখি অনুশীলনে ডান হাতে বল করছে। বয়স তখন মাত্র ১০–১১। বল করতেই একদম বড়দের মতো অফ স্পিন করল। তখনই বলেছিলাম—দু’হাতে বল করবি।’’

কৌশিকের পরিবারও অত্যন্ত সাধারণ। হাওড়ার দুঃস্থ পরিবারের এই ছেলেটি প্রতিভা এবং কঠোর পরিশ্রমে পৌঁছে গেছেন জাতীয় দলের নেটে। নিজেকে এই পর্যায়ে দেখে গর্বিত হলেও পা মাটিতে রাখছেন তিনি। বলেন, ‘‘ভারতীয় দলের সঙ্গে থাকা, তাঁদের নেটে বল করা—এটাই অনেক বড় ব্যাপার। ভবিষ্যতে দলের সদস্য হতে চাই। এটাই স্বপ্ন।’’

সংঘাতময় সময়ে ভারতীয় দলের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল কার্যকর নেট স্পিনার। আর সেই জায়গাতেই কৌশিক মাইতি হয়ে উঠলেন ভরসার নাম। তাঁর প্রতিভা, ধৈর্য এবং অনুশীলন হয়তো তাঁকে আরও বড় মঞ্চে তুলে দেবে—এ আশাই করছেন বাংলার ক্রিকেটকর্তারা।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত