চলতি অর্থবছরে ডলারের তুলনায় রুপির পতন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রার তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে ভারতীয় রুপি। জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের মধ্যে অবমূল্যায়ন ৪.৩ শতাংশ। ২৭ নভেম্বর এক ডলারের বিপরীতে রুপির দর দাঁড়িয়েছে ৮৯.২৭— যা ২০২৫ সালে ভারতের অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রুপির পতন আরও গতি পেতে পারে এবং ডলার ছুঁতে পারে ৯০–এর সীমা। এই সতর্কতা ইতিমধ্যেই আর্থিক বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।


ডলারের সামনে রুপির পতন, এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রার তকমা ভারতের টাকার
রাজনৈতিক বিতর্কে জড়াল রুপির দর পতন
রুপির এমন ঐতিহাসিক দরপতনে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক টানাপড়েন। কংগ্রেস যেখানে কেন্দ্রকে দুর্বল অর্থনীতি ও ভুল বৈদেশিক বাণিজ্যনীতির জন্য দায়ী করছে, সেখানে বিজেপি জবাব দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও মার্কিন চাপই এই অবস্থার কারণ।
তবে দেশের শেয়ার বাজারে এর প্রভাব কার্যত অশনি সংকেত নয়। সেনসেক্স ও নিফটি উল্টে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার ফলে।
অন্য এশীয় মুদ্রার তুলনায় ভারত সবচেয়ে পিছিয়ে
ব্রোকারেজ তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার রিঙ্গিত, তাইওয়ানের ডলার, তাইল্যান্ডের ভাট এবং ইউয়ান ডলারের সামনে স্থিতিশীলতা দেখাচ্ছে। বিপরীতে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশি টাকা, ইন্দোনেশিয়ান রুপিয়াহ, ফিলিপিন্স পেশো এবং ভিয়েতনামের ডঙ। তবে তালিকার একেবারে শেষে ভারতীয় রুপি।


ফলে রুপির পতন এখন আঞ্চলিক আর্থিক মানচিত্রে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
শুল্কনীতিই রুপির অস্থিরতার প্রধান কারণ
বিশেষজ্ঞদের দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক সিদ্ধান্ত ভারতের রফতানিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ভারতীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপানোর ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
আগে যেখানে আমেরিকা ছিল ভারতের বৃহত্তম রফতানি বাজার, সেখানে এখন আমেরিকা থেকে ডলার প্রবাহ কমে আরবিআইয়ের রিজার্ভে চাপ বাড়িয়েছে। ফলে বাজারে ডলার চাহিদা বাড়ছে এবং রুপির পতন আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।
ডলার কেনার চাপেই রিজার্ভে টান
বিশ্ব বাণিজ্যের ৮৫ শতাংশই ডলারে সম্পন্ন হয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য কমতেই ভারত বাধ্য হয়েছে সরাসরি ডলার কেনায়। আরবিআই সোনা ও ডলার কিনতে এগোতেই আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ডলারের উত্থান অনিবার্যভাবে রুপির পতন বাড়িয়ে দিয়েছে।

রুপির অবমূল্যায়নের সুফলও রয়েছে
অর্থনীতির একটি অংশ মনে করছে, পরিস্থিতি মোটেই শুধু নেতিবাচক নয়। রুপির দাম কমলে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্য আরও সস্তা হবে। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া টেক্সটাইল সেক্টর আবার লাভের মুখ দেখতে পারে। ইউরোপ-আমেরিকায় ভারতীয় পরিষেবা ক্ষেত্রও নতুন সুযোগ পাবে।
বিদেশি পর্যটক আসার প্রবণতা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে আমদানি নির্ভর দেশের জন্য বিপদের সম্ভাবনা বেশি
ভারতের আমদানির বড় অংশই অপরিশোধিত তেল, যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স, সার এবং ভোজ্য তেল। রুপির দাম কমলেই আমদানির খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। কেন্দ্রকে বাড়তি ব্যয় টানতে হবে ডলার রিজার্ভ থেকে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা প্রবল।
বাজার ও আরবিআই–এর নজর ডিসেম্বরের মুদ্রানীতি বৈঠকে
৩–৫ ডিসেম্বর আরবিআইয়ের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। আরবিআই গভর্নর সঞ্জয় মলহোত্র ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। রুপির স্থিতিশীলতার জন্য কী পথ বেছে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক, এখন সেদিকেই তাকিয়ে বাজার।
দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বাজারে রুপির অবস্থান পুনরুদ্ধারে বৈদেশিক বাণিজ্যচুক্তির দ্রুত অগ্রগতি অত্যন্ত জরুরি হবে বলেই মনে করছে আর্থিক মহল।








