নজরবন্দি ব্যুরো: ভারতীয় ফুটবলের উঠতি প্রজন্মের সামনে খুলে যাচ্ছে এক নতুন আন্তর্জাতিক মঞ্চ। আগামী ২২ থেকে ৩১ অক্টোবর আজারবাইজানে অনুষ্ঠিত হবে প্রথম FIFA U-15 World Cup & Festival 2026। এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, প্রচলিত অনূর্ধ্ব-১৭ বা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের মতো কঠিন মহাদেশীয় যোগ্যতা পর্ব পেরিয়ে আসার বাধ্যবাধকতা নেই। প্রথম সংস্করণটি বিশ্বের সব ২১১টি FIFA Member Association-এর জন্য উন্মুক্ত।
অর্থাৎ, ভারতের মতো দেশকে প্রচলিত AFC qualifying route-এর মাধ্যমে জায়গা করে নিতে হচ্ছে না। FIFA-র পরিকল্পনাই হল, অনূর্ধ্ব-১৫ স্তরে যত বেশি সম্ভব দেশের তরুণ ফুটবলারকে একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে আসা। FIFA প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো (Gianni Infantino) এই প্রতিযোগিতাকে ২১১ দেশের একটি ফুটবল উৎসব হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে নামের মধ্যে ‘World Cup’ থাকলেও এই প্রতিযোগিতাকে প্রচলিত সিনিয়র বিশ্বকাপের ছকে ভাবলে ভুল হবে। এটি মূলত তরুণ ফুটবলারদের উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং বেশি সংখ্যক দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি একটি নতুন ধরনের FIFA প্রতিযোগিতা। ২০২৬-এর প্রথম সংস্করণে ছেলেদের দল খেলবে। ২০২৭-এর সংস্করণটি মেয়েদের জন্য নির্ধারিত, আর ২০২৮ থেকে ছেলেদের ও মেয়েদের জন্য আলাদা U-15 প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আর নিয়মের জায়গাতেই রয়েছে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। FIFA জানিয়েছে, U-15 ম্যাচগুলি প্রচলিত ম্যাচের তুলনায় কম সময়ের হবে এবং মাঠও হবে ছোট। প্রতি দলে খেলোয়াড়ের সংখ্যা সাত থেকে নয়ের মধ্যে থাকবে। অর্থাৎ ১১ জনের চিরাচরিত ফুটবলের বদলে ছোট মাঠে কম খেলোয়াড় নিয়ে ম্যাচ খেলানো হবে।
এই পরিবর্তনের পিছনে FIFA-র যুক্তিও যথেষ্ট পরিষ্কার। ১৪-১৫ বছরের ফুটবলারদের জন্য ছোট মাঠ ও কম খেলোয়াড়ের ম্যাচে বলের সঙ্গে বেশি সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়। পাসিং, ড্রিবলিং, প্রথম টাচ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ছোট জায়গায় বল ধরে রাখার মতো মৌলিক দক্ষতার উপর স্বাভাবিকভাবেই বেশি জোর পড়ে।
অর্থাৎ এখানে শুধুমাত্র ফলাফল নয়, ফুটবলার তৈরি করাটাই বড় লক্ষ্য। FIFA-র যুব ফুটবল উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে এই প্রতিযোগিতার কাঠামোও সেই কারণেই যুক্ত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণ প্রতিভারা যাতে একই মঞ্চে নিজেদের মেলে ধরতে পারে, সেটাই এই নতুন উদ্যোগের মূল ভাবনা।
ভারতের জন্য বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অনূর্ধ্ব-১৫ স্তরে আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ছোট মাঠের দ্রুতগতির ফুটবল খেলার অভিজ্ঞতা দেশের তরুণদের জন্য বড় শিক্ষার জায়গা হতে পারে। বিশেষ করে ভারতীয় ফুটবলে গ্রাসরুট ও যুব পর্যায়ে টেকনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রশ্ন রয়েছে, এই ধরনের আন্তর্জাতিক exposure সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করার সুযোগ দিতে পারে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার—FIFA এখনও এই প্রতিযোগিতার পূর্ণাঙ্গ match schedule, গ্রুপ ড্র বা চূড়ান্ত অংশগ্রহণকারী তালিকা প্রকাশ করেনি। FIFA-র ঘোষণায় আপাতত ২২-৩১ অক্টোবরের সময়সীমা এবং সব সদস্য সংস্থার জন্য উন্মুক্ত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই ১৬ বা ৩২ দলের প্রচলিত বিশ্বকাপ কাঠামো ধরে আগেভাগে গ্রুপ বা ম্যাচের হিসাব করা ঠিক হবে না।
এখানেই ভারতের সামনে তৈরি হচ্ছে আসল চ্যালেঞ্জ। ছোট মাঠ, কম খেলোয়াড় এবং কম সময়ের ম্যাচ মানে ১১ জনের প্রচলিত ফুটবলের কৌশল হুবহু কাজে লাগবে না। দ্রুত transition, এক-দুই টাচে খেলা, pressing এবং individual decision-making-এর উপর অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তার উপর অনূর্ধ্ব-১৫ বয়সে দল গঠনের বিষয়টিও সহজ নয়। এই বয়সে ফুটবলারদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ দ্রুত বদলায়। ফলে শুধু বর্তমানে কে ভালো খেলছে তা নয়, আন্তর্জাতিক স্তরে কয়েক দিনের মধ্যে নতুন পরিবেশের সঙ্গে কে কত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আর একটি বড় সুবিধা হল—এই প্রতিযোগিতার দরজা কোনও নির্দিষ্ট মহাদেশের কয়েকটি দলের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। FIFA-র ২১১ সদস্য সংস্থাই অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা কিংবা ছোট ফুটবল-দেশ—সব জায়গা থেকেই নতুন প্রতিভা উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
আজারবাইজানও এই আয়োজনের জন্য পরিকাঠামোগত ভাবে প্রস্তুত হচ্ছে। FIFA জানিয়েছে, হাজার হাজার তরুণ খেলোয়াড় ও তাঁদের support staff-কে একটি কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থায় আয়োজন করার মতো ক্রীড়া ও সাধারণ পরিকাঠামো রয়েছে দেশটির। একই সঙ্গে ২০২৭ FIFA U-20 World Cup-এর সহ-আয়োজক হিসেবেও আজারবাইজান নির্বাচিত হয়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রে তাই এই অভিযানকে শুধু ‘বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব কমে যায়। ১৫ বছরের ফুটবলারদের জন্য এটি আন্তর্জাতিক ফুটবলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক বিরল সুযোগ। বড় ফুটবল-দেশগুলির যুব কাঠামো, training intensity এবং ম্যাচের গতি কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের খেলোয়াড় তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ট্রফি জেতা অবশ্যই স্বপ্ন। কিন্তু U-15 World Cup & Festival-এর ক্ষেত্রে আরও বড় সাফল্য হবে—ভারতের তরুণ ফুটবলাররা যদি আন্তর্জাতিক মানের দ্রুত ফুটবলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, নিজেদের technical quality বাড়াতে পারে এবং সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী U-17 ও U-20 স্তরে নিয়ে যেতে পারে। আজারবাইজানের মাটিতে ভারতের আসল লড়াই তাই শুধু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়, নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মকে আরও শক্তিশালী করে তোলারও।



