২২ বছর আগে আজকের দিনেই কলকাতার আলিপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের (Dhananjoy Chatterjee) ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল। সেই মৃত্যুদণ্ড ঘিরে বিতর্ক অবশ্য থামেনি। শুক্রবার, ১৪ অগস্ট, ধনঞ্জয়ের মৃত্যুর ২২ বছর পূর্তিতে বাঁকুড়ার ছাতনায় ফের মিছিল করে মামলার পুনঃতদন্ত ও পুনর্বিচারের দাবি তুললেন গ্রামবাসীদের একাংশ। উঠল স্লোগান, ‘জাস্টিস ফর ধনঞ্জয়’।
ছাতনার কুলুডিহি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন ধনঞ্জয়। তাঁর ফাঁসি নিয়ে এখনও একাধিক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি বলে দাবি করছেন পরিবারের সদস্য এবং আন্দোলনকারীদের একাংশ। শুক্রবার বাসুলি মন্দিরে পুজো দেন ‘ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় মামলা পুনর্বিচার কমিটি’র আহ্বায়ক ড. চন্দ্রচূড় গোস্বামী। তাঁর দাবি, মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্নগুলি রয়েছে, সেগুলির উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত পুনর্বিচারের দাবি জারি থাকবে।
পুজোর পর নতুন করে কমিটি গড়ে আন্দোলনকে আরও সংগঠিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ধনঞ্জয়ের গ্রাম এবং আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ মিছিল করেন। তাঁদের দাবি, এত বছর পরেও মামলাটির সমস্ত দিক নতুন করে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ধনঞ্জয়ের বড় দাদা বিকাশ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, তাঁর ভাই যেভাবে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন, তা নিয়ে পরিবারের সংশয় এখনও কাটেনি। তাঁর কথায়, ধনঞ্জয় ন্যায়বিচার পাননি বলেই পরিবারের বিশ্বাস। প্রকৃত সত্য সামনে আনতে ফের তদন্তের প্রয়োজন বলেও দাবি করেন তিনি।
ঘটনাটির সূত্রপাত ১৯৯০ সালের ৫ মার্চ। কলকাতার ভবানীপুরের আনন্দ অ্যাপার্টমেন্টে ১৮ বছরের এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ ওঠে। মামলার নথি অনুযায়ী, বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে পৌনে ৬টার মধ্যে ঘটনাটি ঘটে। ওই আবাসনের নিরাপত্তারক্ষীদের মধ্যে ছিলেন বাঁকুড়ার ছাতনার কুলুডিহির বাসিন্দা ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়।
তদন্তের পর ধনঞ্জয়কেই মামলার মূল অভিযুক্ত করা হয়। ১৯৯১ সালের ১২ অগস্ট আলিপুরের দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা আদালত তাঁকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড দেয়। পাশাপাশি ৩৭৬ ধারায় যাবজ্জীবন এবং ৩৮০ ধারায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের সাজাও দেওয়া হয়েছিল।
এরপর মামলাটি কলকাতা হাই কোর্টে (Calcutta High Court) যায়। হাই কোর্টও ধনঞ্জয়ের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)-এ আবেদন করা হয়। ১৯৯৪ সালের ১১ জানুয়ারি শীর্ষ আদালতও আপিল খারিজ করে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। পরে রিভিউ আবেদনও খারিজ হয়ে যায়।
এরপরও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের আরও একটি রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পথ কার্যত পরিষ্কার হয়ে যায়। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনও করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৪ সালের ৪ অগস্ট সেই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়।
শেষ পর্যন্ত ২০০৪ সালের ১৪ অগস্ট ভোরে আলিপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সেই ঘটনার ২২ বছর পরও মামলাটি নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি।
ধনঞ্জয়ের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং কয়েক জন মানবাধিকারকর্মীর একাংশ দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় ত্রুটি ছিল এবং ধনঞ্জয় নির্দোষ ছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, মামলার একটি বড় অংশ পরিস্থিতিগত বা পরোক্ষ প্রমাণের উপর নির্ভরশীল ছিল। তবে আদালতের রায়ে ধনঞ্জয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল এবং তাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছিল—এই আইনি ইতিহাসও একই সঙ্গে রয়েছে।
শুক্রবারের কর্মসূচিতে ড. চন্দ্রচূড় গোস্বামী দাবি করেন, তাঁদের আন্দোলন কোনও আবেগের ভিত্তিতে নয়, নথি ও তথ্যের ভিত্তিতে। তাঁর বক্তব্য, বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে মামলাটি ঘিরে থাকা প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
ফলে ২২ বছর পরও ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের মামলা নতুন করে আলোচনায়। ফাঁসি কার্যকর হয়ে গেলেও তাঁর পরিবারের একাংশ এবং পুনর্বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা এখনও থামতে নারাজ। তাঁদের দাবি, সত্যিই যদি কোনও ভুল হয়ে থাকে, তা নথি ও তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসুক—আর সেই কারণেই ফের উঠছে ‘ধনঞ্জয়ের বিচার চাই’ স্লোগান।



