ব্যক্তিগত সততার নিরিখে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতো রাজনীতিবিদ আজও বাংলায় বিরল। আজ, ৮ অগস্ট পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে প্রয়াত হলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি ছিলেন ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের দ্বিতীয় এবং শেষ মুখ্যমন্ত্রী। ২০০০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা এগারো বছর বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বুদ্ধদেব। রাজনীতির পাশাপাশি একাধিক বিষয়ে ছিল তাঁর। কবিতা, নাটক, ক্রিকেটের প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। লিখেছেন একাধিক বই। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি আর কোলাপুরি চপ্পল পড়েই কাটিয়ে দিলেন একটা গোটা জীবন। আজ বুদ্ধদেবের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ রাজনৈতিক মহল।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক জীবন বহুল চর্চিত। একদিক থেকে তিনি বিতর্কিতও বটে। বামপন্থী অন্যান্য নেতাদের মতো ‘চরমপন্থী’ মেজাজ ছিল না বুদ্ধর। বরং ছিলেন অনেকটা সহনশীল। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাংলার শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা যেন বাংলাতেই কাজ করে। যদিও সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে কৃষিজমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে বুদ্ধদেবের বিরোধিতা করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ নন্দীগ্রামে গুলি চালায় পুলিশ। সংঘর্ষে নিহত হন ১৪ জন গ্রামবাসী। ২০১৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলি চালানোর জন্য ভুল স্বীকার করে দুঃখপ্রকাশও করেছিলেন তিনি।
ছোটবেলায় তার প্রথম প্রেম ছিল ক্রিকেট। এছাড়াও খেলতে ভালোবাসতেন কবাডি। যদিও চোখের সমস্যা থাকায় ক্রিকেট নিয়ে আর এগোনো হয়নি। পরবর্তী ক্ষেত্রে বাংলা অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজনৈতিক পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা বুদ্ধদেবের কাছে রাজনীতিতে যোগদান যেন ছিল সময়ের অপেক্ষা।
১৯৬৬ সালে সিপিআইএমের সদস্যপদ গ্রহণ করেন বুদ্ধদেব। দু’বছরের মাথায় তাঁকে গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের রাজ্য কমিটির সম্পাদক করার সিদ্ধান্ত নেয় বাম নেতৃত্ব। আরও তিন বছর পর তিনি হন বঙ্গ সিপিআইএম কমিটির একজন সদস্য। ১৯৭৭ সালে কাশীপুর কেন্দ্র থেকে প্রথমবারের জন্য নির্বাচনে জেতেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রী করা হয় তাঁকে। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে জিতে হন রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই দুই দপ্তরের পাশাপাশি ১৯৯৯ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা বর্ষীয়ান বাম নেতা জ্যোতি বসু বুদ্ধদেবকে উপমুখ্যমন্ত্রীর পদে নিয়ে আসেন। এর এক বছর পর জ্যোতি বসুর অবসর নেন এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে প্রথমবারের জন্য শপথ গ্রহণ করেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এরপর টানা ১১ বছর বাংলার দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
সাহিত্যের প্রতি এক অগাধ ভালোবাসা ছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, কামু, কাফকা এবং মার্কেজের বই সব সময় তাঁর পড়ার টেবিলে থাকত। আর পাঁচটা সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালির মতোই নাটক ও সিনেমার প্রতিও ছিল প্রবল আগ্রহ। যতদিন শরীর ভালো ছিল ততদিন অ্যাকাডেমি কিংবা নন্দনে যেতে নাটক বা সিনেমা দেখার জন্য।
জীবিত কালে একাধিক বই লিখেছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। কবিতার পাশাপাশি গদ্যক্ষেত্রেও ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। গাবরিয়াল গার্সিয়া মার্কেজের উপন্যাস অনুবাদ করেছিলেন তিনি। নাম দিয়েছিলেন ‘বিপন্ন জাহাজের নাবিক’, যেটি একটি যথেষ্ট জনপ্রিয় বই। মার্কেজের ‘ক্ল্যান্ডেস্টাইন ইন চিলি’-কে ভাষান্তর করে নাম দেন ‘চিলিতে গোপনে’। এছাড়াও লিখেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে আলোচনাগ্রন্থ ‘পুড়ে যায় জীবন নশ্বর’। ‘ফিরে দেখা ১ ও ২’-এ বাম সরকারের নানান কাহিনী ফুটিয়ে তোলেন। পরবর্তীক্ষেত্রে লেখেন ‘নাৎসি জার্মানির জন্ম ও মৃত্যু’ ও ‘স্বর্গের নীচে মহাবিশৃঙ্খলা’-এর মতো উল্লেখযোগ্য সব বই।



