সংসদে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর উদ্যাপন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ অধিবেশনে আচমকাই উত্তাপ বাড়ল কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মন্তব্যে। আলোচনার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যে আপত্তি তো উঠেইছিল, তার মধ্যেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়–কে ভুলভাবে ‘বঙ্কিম দাস চট্টোপাধ্যায়’ বলে সম্বোধন করলেন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত। আর তাতেই নতুন করে ক্ষোভে ফুঁসছে বিরোধীরা। তৃণমূল কংগ্রেস সরাসরি অভিযোগ তুলেছে—বাংলার ইতিহাস ও সাহিত্য-ঐতিহ্যকে অপমান করেছে কেন্দ্র।
অধিবেশনে দাঁড়িয়ে শেখাওয়াত বলেন, “বন্দে মাতরম যখন মহান কবি বঙ্কিম দাস চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন…”। তাঁর মুখে বঙ্কিমচন্দ্রের ভুল নাম উচ্চারণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধীদলীয় সাংসদদের প্রতিবাদ শুরু হয়। কয়েক সেকেন্ড থেমে মন্ত্রী আবার বলেন, “বঙ্কিম দাস… বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন…”, কিন্তু নিজেদের ভুল সংশোধনের বদলে তিনি বরং বিরোধীদের ‘বসতে’ ইশারা করেন। এ আচরণকে ‘জমিদারি মনোভাব’ বলে কটাক্ষ করেছে তৃণমূল।
প্রধানমন্ত্রীর পর এবার বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘বঙ্কিম দাস চট্টোপাধ্যায়’ বললেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, ক্ষোভে ফুঁসছে তৃণমূল
তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের অফিসিয়াল X অ্যাকাউন্টে সেই ভিডিও তুলে ধরে লিখেছে, “যিনি ভারতকে ‘বন্দে মাতরম’ দিয়েছেন, সেই ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নামই একাধিকবার ভুল করলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। প্রতিবাদ করলে উল্টে সাংসদদেরই চুপ করানোর চেষ্টা।” দল আরও জানায়, বাংলা ও বাংলার সাহিত্য-ঐতিহ্যকে বিজেপি কখনওই স্তব্ধ করতে পারবে না।
এই বিতর্ক শুরু হয়েছিল সকালে, যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর বক্তব্যের সময় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ বলে সম্বোধন করেন। সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানান তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়। তিনি বলেন, “দাদা নয়, অন্তত বাবু বলুন।” এর পরে মোদী নিজের ভুল স্বীকার করে বলেন, “আচ্ছা, বঙ্কিম বাবু বলব। আপনার ভাবনাকে সম্মান করি। ভুল হয়েছে।”
অধিবেশনের গুরুতর আলোচনার মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের এমন ভুল পরিচয় দুইবার সামনে আসায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে। বিরোধীদের দাবি, জাতীয় গানের স্রষ্টা ও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে সামান্য জ্ঞান না রেখেই এমন মন্তব্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর অযোগ্যতার প্রমাণ।
তৃণমূলের বক্তব্য, বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘বঙ্কিম দাস চট্টোপাধ্যায়’ বলা শুধু একটি ভুল নয়, বাংলার সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে হেয় করা। সংসদে এমন ভুলের মাধ্যমে কেন্দ্র ইচ্ছাকৃতভাবেই বাংলা ঐতিহ্যকে ছোট করতে চাইছে। যদিও সরকারপক্ষের তরফে এখনো এই মন্তব্য নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন কেন্দ্রীয় শাসকদলের জন্য ঐক্যের বার্তা পাঠানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু ভুল সম্বোধন থেকে সৃষ্ট বিতর্কে সেই উদ্দেশ্যই এখন ছাপিয়ে যাচ্ছে। বিরোধীরা দাবি তুলছে, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নিয়ে এমন ভুল করা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘বন্দে মাতরম’ শুধু এক গান নয়, ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু অধ্যায়ের ভিত্তি। আর সেই লেখকের নামই যখন বারবার ভুল বলা হয়, তখন ক্ষোভের কারণ আরও গভীর হয়ে ওঠে।







